Thursday, 8 February 2018

ছোটগল্প - সৎ ও অসৎ এর গল্প।

## সৎ ও অসৎ এর গল্প ##

অসৎ, সংসারে ধনবান, সমাজে ক্ষমতাবান, রাষ্ট্রে দেশপ্রাণ। তবু হারানো প্রেমের মতোই সৎ এর প্রতি আমাদের অগাধ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসে বিশ্বাসী সুহাস এক শিক্ষিত, মার্জিত যুবক। কিন্তু বেকার। তিরবেঁধা পাখির মত বেঁচে আছে। চাকরীর দূরাশা, সঙ্গে প্রেমের প্রত্যাখ্যান, সুহাসের জীবনটা ছিন্ন-ভিন্ন। বেঁচে থাকার ইচ্ছাটুকু নেই।

অতি বড় বিপ্লবী দূর্দিনে ভগবানে বিশ্বাসী। লোকে বলে সুবিধাবাদী। সুহাস, আধ্যাত্মবাদী। দূর্দিনে তাই ভক্তিভরে ভগবানকে ডেকে চলেছে, "ঠাকুর, বেঁচে থাকার একটা রাস্তা দাও।" সুহাসের এত 'মিসকল' দেখে ভগবান'কলব্যাক' করলেন-
-"হ্যালো, হ্যালো কে বলছেন?"
-"বৎস সুহাস, আমি তোমার আরাধ্য দেবতা। তোমার কয়েক কোটি মিসকলে আমি বিচলিত। আমি অবগত, অদ্যকাল তুমি কষ্টে করিতেছ অতিবাহিত। বলো বৎস, কি বর চাহ?"
-"টাকা....প্রভু, শুধু টাকা, শুধু টাকা চাই।"
-"শুধু টাকা! সত্য, ত্রেতা, দ্বাপরে সবাই অমরত্ব চাহিয়াছে! তুমি কি জানো? কলি'তে আইনের ফাঁক দিয়া অমরত্ব পর্যন্ত দিতে পারি!"
-"না প্রভু, আপনি শুধু টাকার ব্যবস্থা করে দিন, বাকি সব আমি কিনে নেব।"
-"তবে তাহাই হউক, গতকাল সায়হ্নের পূর্বে তুমি একটি মানিব্যাগ পাইবে। তাহাতে যা টাকা রাখিবে পরদিবসে তাহা দ্বিগুণ হইয়া যাইবে। তবে সেই টাকা সৎ উপায়ে রোজগার করিতে হইবে। অসৎ উপায়ের ধন দ্বিগুণ হইবে না।"

পরদিন'এ্যামাজন' থেকে মানিব্যাগটি এসে যায়৷ সুহাস সৎ পথে রোজগারের জন্য টিউশান শুরু করে। মাসান্তে উপার্জিত অর্থ মন্ত্রপূত ব্যাগে রাখে, আর সেই টাকা দ্বিগুন হয়ে যায়। এরপর সুহাসের জীবন, হাসি আর গানের ইতিহাস৷ একদিন সে চাকরি পেল, নতুন প্রেম এল। বিয়ে করল।

একদিন মানিব্যাগে রাখা টাকা দ্বিগুণ হল না। সুহাস ভুলে গিয়েছিল শর্তের কথা৷ গত মাসেই সুহাস একটা টেন্ডার পাশ করে ৫% কমিশন পেয়েছে৷ একটা মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে বাড়ি তৈরীর ইঁটগুলো বিনা পয়সায় হাতিয়েছে। দিনে দিনে তার সৎ, অসৎ সকল রোজগার মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে৷ সুহাস দেখল, শুধু সৎ পথে রোজগারের অর্থ দ্বিগুন হলেও সবরকম বিলাস-বৈভব করায়ত্ব করা সম্ভব নয়৷ অসৎ পথে অসীম টাকা৷ ব্যাগের আর দরকার নেই। এদিকে ব্যাগটা ফেলে রেখেও লাভ নেই৷ যদি কোনও আর্তের কাজে লাগে, এই ভেবে সুহাস খুব কাছের বন্ধু সুদীপকে দিয়ে দিল।

সুদীপ, চাকরীর আশা ছেড়ে ব্যবসা করছে৷ বছর পাঁচেক হবে। ব্যবসা চলছে না৷ সংসারে অভাব। সেই মন্ত্রপূত ব্যাগ পেয়ে সুদীপের দিন বদলাতে লাগল৷ সময় এগিয়ে চলে৷ সুদীপের রুগ্ন ব্যবসা জাঁকিয়ে বসে৷ নাম, যশ প্রতিপত্তি লাভ করে সুদীপ৷ তার কাছেও ব্যাগটা একদিন অকেজো হয়ে যায়। ভগবানের সেই শর্ত৷ দু-নম্বর মালপত্র বিক্রি করে এত মুনাফা যে, সৎ পথে রোজগারের কয়েক হাজার গুন বেশী। সুদীপ সেই টাকার মায়া ত্যাগ করতে পারল না। ব্যাগটা ছেড়ে দিল।

সুদীপ ব্যাগটা দিল এক ডাক্তারবাবুকে। ব্যবসার সূত্রে বন্ধুত্ব৷ ডাক্তারবাবু মাইনে পান৷ কিন্তু প্র্যাকটিসটা ঠিক মত জমাতে পারেন নি৷ ফলে ডাক্তারবাবুর আছে-অলটো ৮০০ সিসি, বাড়ি- ঘুপসি, জমা- শুধু এল আই সি৷ ডাক্তারবাবু ইতস্তত করে ব্যাগটা নিলেন। মাইনের সব টাকা মানিব্যাগে রাখেন আর, দ্বিগুন টাকা বের হয়৷ 'লেভেল'টা বৃদ্ধি পায়৷ অন্যদিকে, ডাক্তারবাবুর পসার জমতে আরম্ভ করে, নানা ল্যাবরেটরির মালিক এসে ভীড় করে, ঔষধ কোম্পানীর এজেন্টরা উপহারের ডালি সাজিয়ে বসে থাকে! যথারীতি সৎ রোজগারে ঢুকে পড়ে অসৎ এর ধন। ব্যাগের কাজ থেমে যায়৷

এক ভদ্রলোক ডাক্তারবাবুর কাছে আসতেন চিকিৎসার জন্য৷ কোনও রাজনৈতিক দলের চুনোপুটি৷ কাজকর্মের বালাই নেই৷ সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ান। তবে চেম্বারে দু একবার রোগীদের ক্ষোভ সামাল দিয়েছিলেন৷ ভদ্রলোক দলের উঁচু তলায় কল্কে পেতেন না৷ এনিয়ে তার খুব দুঃখ্য। ডাক্তারবাবু তাকেই দিলেন ব্যাগটা৷ প্রথম প্রথম নেতাটি সৎ পথে রোজগার করে টাকা দ্বিগুন করতেন৷ দিনে দিনে তিনি যখন বড় নেতা হয়ে গেলেন, তখন দেখা গেল তাঁর সৎ পথে কোনও রোজগারই নাই৷ শর্তনুযায়ী ব্যাগে আর টাকা দ্বিগুণ হয় না৷

এরপর ব্যাগটা হাতবদল হয়ে যার কাছে যায় সে, প্রথম প্রথম সততার সাথে শুরু করে শেষমেশ অসৎ এর দলেই ভিড়ে যায়। এভাবেই সভ্যতা এগিয়ে চলে। একসময় জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সুহাস, সুদীপ, ডাক্তার বা জননেতা উপলব্ধি করে সেই মানিব্যাগের জীবন অনেক, অনেক ভালো ছিল। তাই নতুন প্রজন্মকে তারা শিক্ষা দেয় সৎ হও, মানুষ হও।

ছোট গল্প - পুনর্জন্ম

## পুনর্জন্ম ##

দরিদ্র পরিবারে কন্যা সন্তান হয়ে পৃথিবীতে এসেছিল সুজাতা৷ সুজাতার জীবনের অভিশাপ ছিল তার গায়ের রং৷ এককথায় সে কালো৷ মুখের সরলতা বা বুদ্ধিমত্তা সকলের থেকে এগিয়ে থেকেও ভোগবাদী সমাজে সুজাতা মূল্যহীন৷ কারন শত যোগ্যতা থাকলেও আজও নারীর দাম তার শরীর সর্বস্ব।

এই কালো চামড়া সুজাতার জীবনে ছিল শাপে বর৷ পাড়া থেকে স্কুল জীবন, কলেজ থেকে রাস্তাঘাট, স্বচ্ছন্দে চলা ফেরা করতে পারত সে। শত সহস্র লোলুপ দৃষ্টি সুজাতার ওপর পড়ত না। তবে যন্ত্রণা ছিল তার বাবা-মায়ের, একদিকে দারিদ্রতা অন্য দিকে গায়ের রং, কিভাবে মেয়ের বিয়ে দেবে? অর্থ দিয়ে গায়ের রং চাপা দিতে হবে! চিন্তায় দুচোখের পাতা এক করতে পারত না তারা৷

অন্যদিকে সুজাতা চেয়েছিল আপন ভাগ্যকে জয় করতে৷ পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে৷ বাবা-মা এর অবলম্বন হতে৷ তাই সে পড়াশোনায় ভীষন মনযোগী৷ তার বয়সি মেয়েরা যখন বিউটি পর্লারে রুপচর্চা করত, সুজাতা তখন পড়া মুখস্থ করত।

স্কুলজীবন শেষ করে কলেজে ভর্তি হল সুজাতা৷ স্বজনরা সুজাতার বাবাকে পরামর্শ দিলেন মেয়েকে পাত্রস্থ করতে৷ মেয়ে এমনিতেই কালো, তার ওপর যৌবনের লাবন্য চলে গেলে নাকি আর বিয়ে হবে না! সুজাতার বাবা-মা বিভ্রান্ত৷ সুজাতা কিন্তু ভাগ্য জয়ের লক্ষ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ৷ শেষ পর্যন্ত সকলের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে মেয়ের ইচ্ছাকেই মান্যতা দিল বাবা-মা৷ নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় মন দিল সুজাতা৷

সময় চলে যায়, সুজাতার সমবয়সী মেয়েরা বিয়ের পিড়িতে বসে যায়৷ শুধুমাত্র সাদা চামড়ার সুবাদে তারা আজ সুচাকুরে, বিত্তশীল পরিবারের ঘরনী৷ কেউ নিজেই বেছে নিয়েছে জীবনসঙ্গী, কেউ বাবা-মা'র পছন্দের পাত্রে ঢেলে দিয়েছে জীবন-যৌবন। তথাকথিত প্রেম আর প্রাচুর্যের সেই জীবন থেকে সুজাতা তখন বহু যোজন দূরে।

প্রেম বাজারে সুজাতা ব্রাত্য৷ কিশোরী থেকে যৌবনা, সুজাতার জীবন প্রেমহীন৷ অথচ পঞ্চদশী থেকেই তার বান্ধবীদের পিছনে ছেলেদের আনাগোনা৷ কেউ সুজাতাকে সিঁড়ি বানিয়েছে, কেউ সুজাতাকে বন্ধু বানিয়েছে, তবে সুজাতার বন্ধুত্বের জন্য নয়, তারই কোনও বান্ধবীর জন্য। হীনমন্যতা সুজাতাকে যে গ্রাস করেনি তা নয়, কিন্তু সুজাতার স্বপ্ন, সুজাতার সংকল্প তাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি৷

একসময় পড়াশোনা শেষ করল মেয়েটা৷ একটার পর চাকরীর পরীক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়ল সে কিন্তু কোথায় চাকরী? দিন যায়, বয়স এগিয়ে চলে। চাকরি অধরাই থাকে। সুজাতার সমবয়সী মেয়েরা তখন জীবন যৌবনের সব সুখ নিংড়ে নিচ্ছে, রুপ, রস, অলঙ্কার, অহংকারে তাদের জীবন পরিপূর্ণ। আর অসম্পূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে সুজাতা হারিয়ে যেতে বসেছে। সুজাতার বাবা ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললেন। মেয়েকে পাত্রস্থ করতে উঠে পড়ে লাগলেন৷

প্রেম বাজারের মতই বিবাহ বাজারে সুজাতার মূল্য খুবই নগন্য৷ আক্ষরিক অর্থে সুপাত্র বলতে যা বোঝায়, সুজাতার জন্য তা পাওয়া খুবই দুষ্কর৷ উচ্চ-শিক্ষিত হলেও শুধু মাত্র রং এর জন্য সকলেই অপছন্দ করে চলে যায়৷ বেশ কয়েকবার বাতিল হওয়ার পর সুজাতার আত্মসম্মান আর অবশিষ্ট থাকল না৷ হতাশ হয়ে পড়লেন সুজাতার বাবা-মা৷ জানা গেল শেষ পর্যন্ত কোনও এক মাধ্যমিক পাশ পাত্র অনেক টাকা বরপন সহ সুজাতাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে৷

পুনশ্চঃ সুজাতার কথা এই পর্যন্ত জানতাম৷ তারপর অনেক বছর কেটে গেছে৷ সময়ের স্রোতে সুজাতাকে ভুলে গেছি৷

সেদিন শহরের বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিলাম৷ হঠাৎ দেখলাম সুজাতার মা একটা বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে আছে৷ বহুদিন দেখা হয়নি৷ তবু সুজাতার মা কে চিনতে পেরেছিলাম, মুখে বার্ধক্যের ছাপ। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, অপনি কি সুজাতার মা? দৃষ্টি শক্তি কমেছে, তাই অনেক কষ্টে আমাকে চিনতে পারলেন, কিন্তু অশ্রুবর্ষিত নয়নে যা বললেন তা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। জানলাম, শেষ পর্যন্ত চাকরী পায়নি সুজাতা। উপরন্তু স্বামীর অবজ্ঞা, শাশুড়ির অত্যাচার ছিল সুজাতার জীবনের নিত্যসঙ্গী। সে সব সহ্য করে
মেয়েটা যদিও বেঁচে ছিল কিন্তু সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে আর বাঁচতে পারেনি, শুধু চিহ্ন হিসাবে রেখে গেছে এক কন্যা সন্তান। সেই সন্তানকে বড় করতে নতুন জীবনযুদ্ধে নেমেছে সুজাতার বাবা-মা। বিষন্ন মনে মাতৃহারা শিশু কন্যার দিকে তাকালাম, দেখলাম অবিকল সুজাতাই যেন পুনর্জন্ম নিয়ে ফিরে এসেছে!
(শেষ)
বিঃদ্রঃ - শুধু সুজাতা নামটাই পরিবর্তিত।