Thursday, 8 February 2018

ছোট গল্প - পুনর্জন্ম

## পুনর্জন্ম ##

দরিদ্র পরিবারে কন্যা সন্তান হয়ে পৃথিবীতে এসেছিল সুজাতা৷ সুজাতার জীবনের অভিশাপ ছিল তার গায়ের রং৷ এককথায় সে কালো৷ মুখের সরলতা বা বুদ্ধিমত্তা সকলের থেকে এগিয়ে থেকেও ভোগবাদী সমাজে সুজাতা মূল্যহীন৷ কারন শত যোগ্যতা থাকলেও আজও নারীর দাম তার শরীর সর্বস্ব।

এই কালো চামড়া সুজাতার জীবনে ছিল শাপে বর৷ পাড়া থেকে স্কুল জীবন, কলেজ থেকে রাস্তাঘাট, স্বচ্ছন্দে চলা ফেরা করতে পারত সে। শত সহস্র লোলুপ দৃষ্টি সুজাতার ওপর পড়ত না। তবে যন্ত্রণা ছিল তার বাবা-মায়ের, একদিকে দারিদ্রতা অন্য দিকে গায়ের রং, কিভাবে মেয়ের বিয়ে দেবে? অর্থ দিয়ে গায়ের রং চাপা দিতে হবে! চিন্তায় দুচোখের পাতা এক করতে পারত না তারা৷

অন্যদিকে সুজাতা চেয়েছিল আপন ভাগ্যকে জয় করতে৷ পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে৷ বাবা-মা এর অবলম্বন হতে৷ তাই সে পড়াশোনায় ভীষন মনযোগী৷ তার বয়সি মেয়েরা যখন বিউটি পর্লারে রুপচর্চা করত, সুজাতা তখন পড়া মুখস্থ করত।

স্কুলজীবন শেষ করে কলেজে ভর্তি হল সুজাতা৷ স্বজনরা সুজাতার বাবাকে পরামর্শ দিলেন মেয়েকে পাত্রস্থ করতে৷ মেয়ে এমনিতেই কালো, তার ওপর যৌবনের লাবন্য চলে গেলে নাকি আর বিয়ে হবে না! সুজাতার বাবা-মা বিভ্রান্ত৷ সুজাতা কিন্তু ভাগ্য জয়ের লক্ষ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ৷ শেষ পর্যন্ত সকলের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে মেয়ের ইচ্ছাকেই মান্যতা দিল বাবা-মা৷ নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় মন দিল সুজাতা৷

সময় চলে যায়, সুজাতার সমবয়সী মেয়েরা বিয়ের পিড়িতে বসে যায়৷ শুধুমাত্র সাদা চামড়ার সুবাদে তারা আজ সুচাকুরে, বিত্তশীল পরিবারের ঘরনী৷ কেউ নিজেই বেছে নিয়েছে জীবনসঙ্গী, কেউ বাবা-মা'র পছন্দের পাত্রে ঢেলে দিয়েছে জীবন-যৌবন। তথাকথিত প্রেম আর প্রাচুর্যের সেই জীবন থেকে সুজাতা তখন বহু যোজন দূরে।

প্রেম বাজারে সুজাতা ব্রাত্য৷ কিশোরী থেকে যৌবনা, সুজাতার জীবন প্রেমহীন৷ অথচ পঞ্চদশী থেকেই তার বান্ধবীদের পিছনে ছেলেদের আনাগোনা৷ কেউ সুজাতাকে সিঁড়ি বানিয়েছে, কেউ সুজাতাকে বন্ধু বানিয়েছে, তবে সুজাতার বন্ধুত্বের জন্য নয়, তারই কোনও বান্ধবীর জন্য। হীনমন্যতা সুজাতাকে যে গ্রাস করেনি তা নয়, কিন্তু সুজাতার স্বপ্ন, সুজাতার সংকল্প তাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি৷

একসময় পড়াশোনা শেষ করল মেয়েটা৷ একটার পর চাকরীর পরীক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়ল সে কিন্তু কোথায় চাকরী? দিন যায়, বয়স এগিয়ে চলে। চাকরি অধরাই থাকে। সুজাতার সমবয়সী মেয়েরা তখন জীবন যৌবনের সব সুখ নিংড়ে নিচ্ছে, রুপ, রস, অলঙ্কার, অহংকারে তাদের জীবন পরিপূর্ণ। আর অসম্পূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে সুজাতা হারিয়ে যেতে বসেছে। সুজাতার বাবা ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললেন। মেয়েকে পাত্রস্থ করতে উঠে পড়ে লাগলেন৷

প্রেম বাজারের মতই বিবাহ বাজারে সুজাতার মূল্য খুবই নগন্য৷ আক্ষরিক অর্থে সুপাত্র বলতে যা বোঝায়, সুজাতার জন্য তা পাওয়া খুবই দুষ্কর৷ উচ্চ-শিক্ষিত হলেও শুধু মাত্র রং এর জন্য সকলেই অপছন্দ করে চলে যায়৷ বেশ কয়েকবার বাতিল হওয়ার পর সুজাতার আত্মসম্মান আর অবশিষ্ট থাকল না৷ হতাশ হয়ে পড়লেন সুজাতার বাবা-মা৷ জানা গেল শেষ পর্যন্ত কোনও এক মাধ্যমিক পাশ পাত্র অনেক টাকা বরপন সহ সুজাতাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে৷

পুনশ্চঃ সুজাতার কথা এই পর্যন্ত জানতাম৷ তারপর অনেক বছর কেটে গেছে৷ সময়ের স্রোতে সুজাতাকে ভুলে গেছি৷

সেদিন শহরের বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিলাম৷ হঠাৎ দেখলাম সুজাতার মা একটা বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে আছে৷ বহুদিন দেখা হয়নি৷ তবু সুজাতার মা কে চিনতে পেরেছিলাম, মুখে বার্ধক্যের ছাপ। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, অপনি কি সুজাতার মা? দৃষ্টি শক্তি কমেছে, তাই অনেক কষ্টে আমাকে চিনতে পারলেন, কিন্তু অশ্রুবর্ষিত নয়নে যা বললেন তা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। জানলাম, শেষ পর্যন্ত চাকরী পায়নি সুজাতা। উপরন্তু স্বামীর অবজ্ঞা, শাশুড়ির অত্যাচার ছিল সুজাতার জীবনের নিত্যসঙ্গী। সে সব সহ্য করে
মেয়েটা যদিও বেঁচে ছিল কিন্তু সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে আর বাঁচতে পারেনি, শুধু চিহ্ন হিসাবে রেখে গেছে এক কন্যা সন্তান। সেই সন্তানকে বড় করতে নতুন জীবনযুদ্ধে নেমেছে সুজাতার বাবা-মা। বিষন্ন মনে মাতৃহারা শিশু কন্যার দিকে তাকালাম, দেখলাম অবিকল সুজাতাই যেন পুনর্জন্ম নিয়ে ফিরে এসেছে!
(শেষ)
বিঃদ্রঃ - শুধু সুজাতা নামটাই পরিবর্তিত।

No comments:

Post a Comment