Tuesday, 18 September 2018

(এটা শুধুই গল্প। বাস্তবের সাথে মিল খুঁজে লাভ নেই এবং কেউ রাজনৈতিক মন্তব্য করবে/ করবেন না প্লিজ)
## র‍্যাঞ্চো রাজা ও নতুন ভোর ##
কোনো এক সময়ে এক ভীষণ বিশৃঙ্খল রাজ্য ছিল৷ যেখানে মারামারি, কাটাকাটি, লেগেই থাকে৷ শান্তি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন নতুন রাজা আসে আর যায়৷ সবাই যেমন খুশি ভোগ করে কেটে পড়ে৷ প্রজারা সেই হিংসা হানানানি করেই মরে৷
রাজ্যের শান্তিপ্রিয় প্রজারা শেষমেষ চুপচাপ থাকতে পারলো না৷ সবাই জোটবদ্ধ হয়ে ঠিক করল, রাজ্যের মধ্যে একটা সীমারেখা টানা হবে৷ সেই রেখার একদিকে থাকবে শান্তিপ্রিয় প্রজারা আর অন্যদিকে খুনী আসামী, গুন্ডা, মস্তান ইত্যাদিরা৷ শান্তিপ্রিয় অংশে কারও রক্তের নেশা উঠলে তাকে সীমারেখার ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে৷
এ তো গেল প্রজাদের জন্য। রাজাদের নিয়ম করা হল দশ বছরের জন্য রাজাকে নির্বাচিত করা হবে৷ সেই রাজা শাসনকালে যা ইচ্ছে করতে পারবে। প্রজাদের কাছে তাকে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে করের টাকা ইচ্ছামত খরচ বা ভোগ করতে পারবে। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে রাজার ঠিকানা হবে খুনী আসামী, গুন্ডা, মস্তানদের মাঝে।
দশবছর পর রাজ্যে রাজা হবার জন্য লম্বা লাইন পড়ত৷ গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজা নির্বাচিত হবার পর রাজা শপথ নিত মহা ধুমধাম করে। আবার যেদিন তার দিন ফুরিয়ে যেত, সেদিন তার হাত-পা বেঁধে একই রকম ধুমধাম করে রেখে আসা হতো গুন্ডা মস্তানদের মাঝে। সেখানে রাজার কী পরিণতি হত সে খবর কেউ জানতে পারত না৷
এভাবেই শত শত বছর চলছিল ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু এক সময় দেশটিতে রাজার আকাল পড়ল। দিনে দিনে জানাজানি হয়ে গেল মেয়াদ ফুরানোর পর রাজার দূর্দশার কথা৷ গুন্ডা মস্তানদের এলাকায় একদা রাজাকে যে যা পারে গালাগাল দিত। প্রকাশ্যে চড় থাপ্পড়, এমনকি জুতোপেটা পর্যন্ত করত৷ রাজার বউ ছেলে-মেয়ে আতঙ্কে বাইরে বের হতে পারত না। কেউ কেউ রাজার বাড়ির দরজায় মলত্যাগ করে আসত ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এসব জানাজানি হওয়ার পর এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল যে, কেউ আর সেই রাজ্যে রাজা হতে চাইল না।
এ অবস্থায় প্রজারা রাজা খুঁজতে বিজ্ঞাপন দিল৷ রাজা হওয়ার ইচ্ছা অনেকেরই ছিল কিন্তু দশবছর পরের কথা ভেবে সবাই পিছিয়ে যায়৷ বড় বড় গোঁফওয়ালা, হিম্মতওয়ালা, টিভি চ্যানেলে বাঘমারা লোকেদের হাতে পায়ে ধরা হল কিন্তু কেউ রাজা হতে রাজি হল না৷
শেষমেষ থ্রি ইডিয়টের র‍্যাঞ্চো মার্কা এক যুবক রাজা হতে রাজি! যথারীতি ধুমধাম করে হয়ে গেল রাজার শপথ গ্রহণ৷ রাজ্যটা আবার গড়গড়িয়ে চলতে লাগল৷ অন্য রাজাদের মতই র‍্যাঞ্চো রাজা যেমন খুশি চলে, কোষাগার থেকে রাশি রাশি টাকা ব্যয় করে৷ ভোগ বিলাসে জীবন কাটায়৷ রাজার শত্রুরা মনে মনে হাসে৷ মাত্র দশটা তো বছর৷ তার পর শুরু হবে লাথি ঝাঁটার জীবন!
যাইহোক, দেখতে দেখতে র‍্যাঞ্চো রাজা তার দশ বছরের শাসন পূর্ণ করল। প্রথামাফিক মেয়াদ পূর্তির দিনে সবাই শোভাযাত্রা করে চলল রাজাকে নির্বাসন দিতে। এই সময়ে একটা ব্যাপার দেখে সবাই অবাক! আগে প্রত্যেক রাজাকে বেঁধে নিয়ে যেতে হত৷ কেউ স্বেচ্ছায় যেতে চাইত না। কিন্তু এই রাজা হাসতে হাসতে চলেছে৷ শোভাযাত্রা যখন গুন্ডাদের এলাকায় প্রবেশ করল তখন সবার চক্ষু ছানাবড়া! চারিদিকে ঝাঁ চকচকে রাস্তা। রাস্তার ধারে বড় বড় গাছ৷ চারিদিকে স্কুল, কলেজ হাসপাতাল৷ বড় বড় কারখানা। ছেলেরা স্কুলে যাচ্ছে। যুবক যুবতীরা গাছের ছায়ায় প্রেম করছে। লোকজন সদা ব্যস্ত৷
জানাগেল সিংহাসনে বসে প্রথমদিনই র‍্যাঞ্চো রাজা মনোযোগ দিয়েছিল হিংসা কবলিত জায়গাটির উন্নয়নের দিকে। বিদেশ থেকে ইঞ্জিনিয়ার, কারিগর ও যন্ত্রপাতি আমদানি করে সে হিংসা ক্ষেত্রকে শস্যক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী সে স্থানে পুকুর, খাল ও নিজের বসবাসের জন্য বিশাল এক প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল।
রাজা একটি কথা সব সময় মনে রেখেছিল, দশ বছরের শাসনকাল সে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে কাটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সে তা করেনি। ওই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সে তাঁর মেয়াদকাল কিংবা তার পরবর্তী সময়কে আরামদায়ক বানিয়েছিল। র‍্যাঞ্চো রাজার এই চিন্তা ভাবনা রাজ্যটাকে হিংসা মুক্ত করে এক নতুন ভোর এনে দিয়েছিল।
## ফুকু সিং এর গল্প ##
এক সময় দুম-ফটাস্ নামে এক দেশ ছিল৷ সেই দেশের রাজা ছিলেন ঘ্যাঁচাং ফু৷ সেই দেশে দুম করে কেউ কাউকে চিমটি কাটত না৷ কেউ কাউকে ল্যাং মারত না৷ সীতা হরণ বা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ হত না৷ ধনরত্ন সব বিছানার নিচে থাকত৷ তাই রাজার রাজকার্য বিশেষ ছিল না৷
এমনই এক বর্ষাকালে রাজা ঘ্যাঁচাং ফু ভাবলেন একটা গল্পের প্রতিযোগিতা করবেন৷ সভাসদরা প্রচারে নেমে পড়ল৷ নানা রাজ্যে দূত পাঠানো হল৷ পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হল৷ রাজভবনের সম্মুখে স্লাইকোরামা পদ্ধতিতে মঞ্চ বেঁধে শুরু হল প্রতিযোগিতা৷ দুম-ফটাস নগরের পাবলিক থেকে পিঁপড়ে সবাই সেখানে হাজির।
প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গল্প হচ্ছে ৷ দুনিয়ার যত গল্পদাদু, ঠাকুমা গল্প শোনাচ্ছে৷ রাজার কোনোটাই পছন্দ হয় না। শেষমেষ ৬৮°৭' ও ৯৭°২৫' পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত এক দেশ থেকে একজন গল্প শোনাতে এলেন৷ নাম তার ফুকু সিং।
সে গল্প শুরু করল,"মহারাজ আমি এমন এক দেশের গল্প বলব সেখানে রাজা নেই তবে গন্ডা গন্ডা মন্ত্রী ছিল৷"
রাজা বললেন, "রাজা নেই মন্ত্রী, এমন দেশ আবার হয়? যত্তো সব বাজে গল্প৷"
ফুকু বলতে লাগল,"শুনুন মহারাজ,সেই দেশ ছিল নদীমাতৃক৷ অথচ সেখানে নদীর ওপর সেতু তৈরি হত না, রাস্তা কেটে সেতু তৈরি হত!"
ঘ্যাচাং ফু মুচকি হেসে বললেন,"বেড়ে বলেছ তো! রাস্তা কেটে নদী!"
ফুকু সিং বলল,"শুধু তাই নয়, সেখানের লোকেরা মাটি কেটে গর্ত করত আবার সেই মাটি গর্তে ফেলত৷ সেই দেশের সবচেয়ে বড় পত্রিকা একবার সেসব গর্তের ছবি দিয়েই এক দিনের কাগজ ছেপেছিল।"
রাজার হাসি আর ধরে না। এতক্ষণে পাওয়া গেছে এক আসল গল্পকার। রাজা কৌতূহল নিয়ে বললেন,"এত অনাচার, দেখার কেউ ছিল না? দেশ চালাত কারা?"
ফুকু বলল,"সেই দেশ চালত মন্ত্রীরা, তবে মন্ত্রী হতে গেলে আগে অনেক কালো টাকার মালিক হতে হত। তাছাড়া যার নামে বেশি মামলা,সে বড় মন্ত্রী৷"
রাজা বললেন,"বলো কি হে! পাইক পেয়াদা ছিল না? হাকিম ছিল না?"
"সবই ছিল হুজুর, পাইক-পেয়াদা সব মন্ত্রীদের বাঁদা৷ আর হাকিম? ভোটের ঝামেলা, ব্যাঙ্কলুঠের মামলা আর শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে রায় দিতে দিতেই ক্লান্ত হয়ে যেত। অন্যকিছু বিচারের কোনও এক্সপায়ার ডেট ছিল না।" ফুকু সিং আরও বলল,"চুরি সেখানে বৈধ ছিল৷ সৎ পথে রোজগারে বেশী আয়কর, অসৎ পথে রোজগারে কম কর!"
রাজা গল্পে মজা পেয়ে জানতে চাইলেন, "কিন্তু এভাবে একটা দেশ তো চলতে পারে না? সে দেশে ব্যবসা বানিজ্য নেই?"
ফুকু মাথা চুলকে বলল,"আছে হুজুর। তবে যার ব্যবসা সবচেয়ে কম সেই বড় ব্যবসায়ী।"
ঘ্যাঁচাং ফু বললেন,"সেটা কীভাবে সম্ভব?"
"সেটাই হয় হুজুর, যার ব্যবসা চলে না সে ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে, শেষে ব্যাংকের টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়৷"
রাজা বললেন,"সে দেশে বুদ্ধিজীবি ছিল না? তার প্রতিবাদ করত না?"
ফুকু সিং বলল,"ছিল তো, তবে চিত্রকর, কবি, সাহিত্যিক সবাই মন্ত্রীদের ইয়ের কথায় ছবি আঁকত, কবিতা লিখত, গল্প লিখত৷ নাট্যকার আবার মন্ত্রীদের বোতলবন্ধু হয়ে থাকত৷ কেউ মিউ মিউ করলে মন্ত্রীরা মাছের কাঁটা ছড়িয়ে দিত৷
রাজা খানিকক্ষণ হতভম্ব হয়ে ফুকু সিং এর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর রাজসভা কাঁপিয়ে হাসতে থাকলেন। বললেন,"আর বলতে হবে না, ওরে, কে আছিস, ফুকু সিং কে প্রথম পুরস্কারটা দিয়ে দে।"
(বড় হলেও এক নিঃশ্বাসে পড়া যাবে। হৃদয় ছুঁলে বোলো / বলবেন)
## ভগবান ##
বেশকিছুদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছে শ্যামল৷ সহধর্মীনি বারবার বলছে,"একবার বড় ডাক্তার দেখিয়ে এসো" অথচ শ্যামলের হেলদোল নেই৷ তবে সেটা স্বভাবে নয়। অভাবে। একবার বড় ডাক্তারের কাছে গেলে কত খরচ সেটা শ্যামল ভালো করেই জানে। অথচ রোজগার বলতে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মূল্য ছাড়া আর কিছু নেই ।
শেষমেষ পারল না শ্যামল, চোখদুটো খুব জ্বালা করছে৷ দেখতেও সমস্যা হচ্ছে৷ এবার ডাক্তার না দেখালেই নয়৷ খোঁজ নিয়ে জানতে পারল তারই বাল্যবন্ধু অনিন্দ্য এখন কাছের শহরে চেম্বার করছে৷ শ্যামলের মনটা খুশিতে ভরে উঠল৷ কতদিন অনিন্দ্যর সাথে দেখা হয়নি৷ মাধ্যমিক পর্যন্ত একসাথে পড়াশোনা করেছিল ওরা। তবে লেখাপড়ায় অনিন্দ্যর ধারে কাছে ছিল না শ্যামল৷ তবু ওদের বন্ধুত্ব ছিল। কারণ কিশোর বয়স জানে না মেধা, অর্থ ও যশের ভেদাভেদ। সেখানে শুধুই হৃদয় আর আবেগ।
রাতে বাড়ি ফিরে শ্যামল বউ কে বলল, "কালকেই চোখের ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি, আর জানো, সে ডাক্তার আমার ছোট বেলার বন্ধু৷" সর্বশিক্ষায় পাশ শ্যামলের গৃহীনি ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল,"কবে থেকে বলছি, হুঁশ নেই, চোখের বারোটা বেজে গেল, তারপর ডাক্তার৷" শ্যামল বলল, "তুমি জানো না, অনিন্দ্য কত বড় ডাক্তার, পঞ্চা জেঠু বলছিল ওর হাতে পড়লে দু-দিনেই সেরে যাবে৷ দেশ বিদেশ থেকে ওর ডাক পড়ে৷ নির্ঘাত গ্রামের স্মৃতি ভুলতে পারেনি বলে এখানে আসে৷ তাছাড়া তুমি দেখবে, অনিন্দ্য আমাকে দেখলে আর ছাড়তেই চাইবে না৷ পয়সাকড়ি দুরের কথা, ঔষধপত্রও দিয়ে দেবে৷" "ঐ আশায় থাকো, তারপর দেখবে তোমাকে চিনতেই পারবে না৷ ঝাঁটামারি বন্ধুত্বের, কত দেখলুম৷ পয়সাকড়ি যা লাগে লাগুক আগে চোখটা ভালো করো ৷" কঠিন কথাগুলো সহজেই বলে গজগজ করতে লাগল শ্যামলের গৃহীনি।
পরদিন সকালেই গেল শ্যামল৷ চেম্বারে যখন পৌছাল তখন ৭-০০ টা বেজে গেছে৷ ডাক্তার আসবেন ৯-০০ টায়৷ দু-এক জন ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে৷ নাম লিখাতে গিয়ে ধাক্কা খেল শ্যামল৷ ৭০ নম্বরে তার নাম৷ শ্যামল ভেবেছিল অনিন্দ্য হয়ত তার ফীজটা নেবে না৷ কিন্তু কড়কড়ে ২০০ টাকা দিতে তবে নাম লিখেছে ডাক্তারের চ্যালা চামুন্ডরা৷ কী দেমাক তাদের, ভাবখানা এমন- ইচ্ছা হলে থাকুন না হলে কেটে পড়ুন৷
চেম্বারের বাইরে বসে এই অপমানটা হজম করছিল শ্যামল৷ ব্যাটারা যদি জানত শ্যামল কে, তাহলে...........৷ চেম্বারে ঢোকার দরজায় নেমপ্লেট, সেখানে বড় বড় করে লেখা, ডাঃ অনিন্দ্য রায়, এম বি বি এস (এম.এস)৷ শ্যামলের মনে পড়তে লাগল স্কুল জীবনের কথা৷ অনিন্দ্যর জন্য সেকেন্ড বেঞ্চের ধারে নিয়মিত জায়গা রাখত সে৷ গাছের সবথেকে বড় বড় পেয়ারা মাকে লুকিয়ে স্কুলে নিয়ে আসত, শুধু অনিন্দ্যকে দেবে বলে৷ ভালো খেলতে পারত না অনিন্দ্য, তবু স্কুলের খেলায় অনিন্দ্যর নাম থাকত৷ কারন লিষ্টটা তৈরী করত শ্যামল৷ সে জানত অনিন্দ্য পারবে না, তবে অনিন্দ্যর খামতি সে নিজে পূরণ করে দেবে৷ কারণ খেলাধুলায় শ্যামল ছিল স্কুলের সেরা৷
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন ৯টা বেজে গেছে৷ লোকজন গিজগিজ করছে৷ বসার জায়গা সীমিত, বেশীরভাগ লোক দাঁড়িয়ে৷ ডাঃ রায় গাড়ি থেকে নেমে শশব্যস্ত হয়ে চেম্বারে ঢুকলেন৷ ডাক্তারের চ্যালা চামুন্ডরা ততধিক ব্যস্ততার ভান দেখিয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে লাগল৷ ভীড়ের মাঝে অনিন্দ্যকে ভাল করে দেখতেই পেল না শ্যামল।
৭০ নম্বরে নাম৷ কখন যে হবে ঠিক নেই ৷ সকালে মুড়ি খেয়েছিল শ্যামল৷ ভেবেছিল বাড়ি ফিরে ভাত খাবে কিন্তু যা অবস্থা তাতে কখন ডাক্তার দেখানো হবে তারই ঠিক নেই৷ তবু ধৈর্য্য ধরে বসে থাকল সে৷ কতদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা হবে। সে তখন নিখাদ বন্ধুত্বের সুখস্মৃতিতে আচ্ছন্ন। তবে মাধ্যমিকের পর ওদের এক বেঞ্চে বসা হয়নি৷ কারন অনিন্দ্য বিজ্ঞানে আর শ্যামল কলাবিভাগে৷ তবু ওদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল৷ সেবার শুধু অনিন্দ্যর জন্যই বিজ্ঞান বনাম কলাবিভাগের খেলায় ইচ্ছা করে গোল মিস্ করেছিল শ্যামল। যাতে অনিন্দ্যর বিজ্ঞান বিভাগ জিততে পারে।
প্রায় দুটো বেজে গেছে, ডাক পড়ল ৭০ নম্বরের৷ জীবনে প্রথাম এ সি ঘরে ঢুকল শ্যামল৷ ডাক্তারের কাছে পৌছানোর আগে সহকারীরা চোখ পরীক্ষা করলেন। শ্যামল ভাবছে, অনিন্দ্যকে তুই বলবে না আপনি বলবে? চল্লিশের রংচটা বৃদ্ধসুলভ যুবক ডাক্তারকে তুই বললে ডাক্তারের সম্মানহানী হতে পারে। এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অনিন্দ্যর মুখোমুখি হল শ্যামল। দেখল, এ কোন অনিন্দ্য! চেহারা পুরো পাল্টে গেছে! শ্যামলা রংয়ের ছেলেটা আজ গৌরবর্ণ হয়েছে! শ্যামল কিছু বলার আগেই অনিন্দ্য বলল, "বলুন কি সমস্যা হচ্ছে?" ইতস্তত করে সমস্যার কথা বলল শ্যামল, যন্ত্র দিয়ে খুব দ্রুত শ্যামলের চোখ দেখেই খচ খচ করে প্রেসক্রিপশন লিখে দিল ডাক্তার অনিন্দ্য। ডাক্তারের সহকারী বলল,"আসুন আসুন বাইরে আসুন৷" কিছু বলতে যাচ্ছিল শ্যামল, কিন্তু পরের রোগী দরজায় দাঁড়িয়ে৷ সে আর দাঁড়াতে পারল না৷ বেরিয়ে এল৷ ড়াক্তারের সহকারী তাকে বুঝিয়ে বলল ডাক্তাবাবু প্রেসক্রিপশানে কি লিখেছেন৷
বিমর্ষ মনে বাড়ি ফিরল শ্যামল৷ মাথা ঘুরছে। সহধর্মীনিকে বলল,"তাড়াতাড়ি খেতে দাও, খুব খিদে পেয়েছে৷"এক্ষুনি দিচ্ছি কিন্তু ডাক্তার কি বলল, বন্ধু তোমায় চিনতে পেরেছিল তো? শ্যামল কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না, শুধু বলল "চিন্তা কোরো না, ভগবান আছে, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
(দেখুন তো, ঠিকঠাক লিখতে পারছি কি না? )
## রজতের শিক্ষালাভ ##
গৃহবাসী হয়েও বনবাসী বিকাশবাবু৷ তবে সে বনবাস, ইঁট পাথরের জঙ্গলে এক সুখের নিবাস৷ নিজে সরকারি চাকুরে। নীলমনি বৌ-নিয়ে সেখানে নিশিযাপন করেন। আর আছে ছেলে। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার আগে বিকাশবাবু মহামূল্যবান দুটো জিনিস বেকার ভাই এর হাতে দিয়ে এসেছেন, সেটা হল বাবা-মা৷ গ্রামে নাকি পড়াশোনার পরিবেশ নেই, সুযোগ সুবিধা নেই। তাই এই বনবাস।
বিকাশবাবু জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন, তাঁর বাবা যদি তাকে দামী টিউশন দিতেন, নামী স্কুলে ভর্তি করতেন, হরলিক্স কমপ্লানের বিজ্ঞাপন দেখতেন, তাহলে তিনি আর একটা আব্দুল কালাম হতে পারতেন। নিজের ছেলের ক্ষেত্রে সে ভুল তিনি করতে চান না৷
এহেন বিকাশবাবুর ছেলে রজত এখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে৷ ঘুম ভেঙে পিডিয়াসিওর খেয়ে রজতের পড়া শুরু৷ গুরু আসেন ছাত্রগৃহে৷ শুধু অংক, ইংরাজী নয়, সমস্ত বিষয়ে তার দীক্ষা লাভের গুরু আছে৷ রীতিমত গোয়েন্দাগিরি করে রজতের গুরুকুল তৈরী করেছেন বিকাশবাবু৷ ছেলে না পারলে গুলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা রেখেছেন তিনি৷
বাবা-মা’র বেঁধে দেওয়া ছকে কিশোর রজত হামাগুড়ি দেয়৷ খেলার সময় নাই। যদি পাওয়া যায়, সেও মায়ের পাহারায়৷ জোরে ছুটবে না, ফুটবল খেলবে না, ঠেলাঠেলি করবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি আইন৷ যদি আছাড় খায়, যদি ছিঁড়ে যায়! তাহলে ছেলের যতটা জ্বালা করে মা-বাবার তার থেকে বেশী ফাটে৷ ছোট্ট রজত ভাবে এটাই জীবন৷ বাবা-মার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলাই ছোটদের কাজ৷ বাবা-মা বলেছেন, "কটা তো বছর, কষ্ট করে পড়াশোনা করলে ভবিষ্যতে সুখ'ই সুখ!" তখন সে "প্লেনে চড়তে পারবে, ফোর্ড-বোলেরো নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবে, বিদেশে হনিমুনে যেতে পারবে!" রজত তাই মন দিয়ে পড়াশোনা করে৷ বাবা-মার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে৷ ক্লাসে ভালো রেজাল্টও করে৷ বিকাশবাবু দেখেন, তাঁর স্বপ্নের রথ কেমন তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে৷
রজতের গুরুকুল রজতকে গুরুমারা বিদ্যা শেখান! আর রজতের মা রজতকে শেখান স্বজনহারা বিদ্যা! তাই রজত ভালো করে জানে না, কে তার পিসি, কে তার মাসী, কে তার কাকু-কাকিমা, আর কত ভালবাসে দাদু ঠাকুমা। এরই মধ্যে নিয়ম করে রজতকে নীতি শিক্ষার পাঠ দেন তার বাবা-মা। ভূবনের গল্পের উদাহরণ দিয়ে বলেন, "না বলিয়া কখনও পরের দ্রব্যে হাত দেবে না, কদাচ মিথ্যা কথা বলিবে না... চুরি করা মহাপাপ...." ইত্যাদি ইত্যাদি।
রজত ছেলেটা বড্ড লাজুক। আসলে জন্মের পর সে কোনদিন নেংটু থাকেনি। অট্টহাসি হাসি হাসেনি। মা বাধা দেন। আনন্দ চিৎকারে শাসন করেন। কাঁদলে বলেন,"মেয়েদের মত কাঁদবে না।" "বেশী খাবে না।" "কম খাবে না।" "এদিকে তাকাবে না।" "ওদিকে তাকাবে না।" আরো কতশত "না" আছে, সব বলা যাবে না।
রজতদের বাড়ির কাছাকাছি এক মন্দিরে সেদিন বাৎসরিক পুজো। মহা সমারোহ।গ্রামের বাড়ি থেকে রজতের দাদু-ঠাকুমা এসেছেন। পাড়ায় উৎসবের মেজাজ। রজত মা এর কাছে আব্দার করল পাড়ার বন্ধুদের সাথে ঠাকুর দেখতে যাবে। মা বললেন, "যাও তবে বেশী দেরী করবে না।" বাঁধন ছেঁড়ার আনন্দে রজত নতুন পোষাক পরিধান করে পুজো দেখতে গেল।
ঠাকুর দেখে বিষন্ন মনে বাড়ি ফিরল রজত। মা জিজ্ঞাসা করলেন, "কী হয়েছে? মুখখানা ভার কেন? কাঁদো কাঁদো স্বরে রজত বলল,"জুতো খুলে মন্দিরে ঢুকেছিলাম, বাইরে বেরিয়ে দেখি জুতো জোড়া নেই।" ব্যস, তুবড়িতে আগুন লাগল। কর্কশ কন্ঠে মা বলতে লাগলেন,"এই সেদিন বাটা'র শোরুম থেকে কিনলাম, এরই মধ্যে চোরের পেট ভরিয়ে চলে এসেছ! আর কিনে দিতে পারব না। ঐ চপ্পল পায়ে সব জায়গা যাবে বোকা, অকর্মন্য। নিজের জিনিস সামলে রাখতে পারে না৷ এভাবে চললে সারাজীবন লোক ঠকিয়েই যাবে, কিচ্ছু করতে পারবে না৷" চিৎকার শুনে বেরিয়ে এসে রজতের দাদু বললেন" আহা, ওভাবে বকাবকি করছ কেন বৌমা, কেউ যদি নিয়ে চলে যায় ও কি করবে?" " কি করবে? কেন? একটু বুদ্ধি খরচ করে ও কারও জুতো নিয়ে আসতে পারল না।" বৌমার এই কথায় বিস্মিত শ্বশুর বললেন, "এমন বলতে নেই বৌমা, ও ভুল শিক্ষা পাবে।" "আপনাদের যুগ চলে গেছে বাবা, বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে পদে পদে ঠকতে হবে৷" বৌমার যুক্তিতে হার মানলেন বৃদ্ধ শ্বশুর৷ চুপ করে গেলেন৷ ক্রন্দনরত নাতিকে শান্তনা দিতে দিতে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন৷
ব্যাপারটা ছাইচাপা আগুনের মত আপাত শান্ত হয়ে গেছে, বাড়ির সবাই দিবানিদ্রায় মগ্ন৷ শুধু রজতের চোখে ঘুম নেই, মায়ের কথা শুনে সে ভাবছে, এটা কেমন নিয়ম, চুরি করা মহাপাপ আবার চুরি করতে না পারলে বোকা, অকর্মন্য! কিন্তু চুরি করা তো অন্যায়৷ তবে কি অন্যায়টাই নিয়ম? কিশোর মন অঙ্কটা বুঝতে পারল না৷ তবে মায়ের বুদ্ধিটা তার দারুণ লেগেছে, কিন্তু তার মাথায় কেন এল না? নিজেকে সত্যিই বড্ড বোকা লাগছে তার৷
রজতের হঠাৎই মনে হল মায়ের বুদ্ধিটা তো এখনও কাজে লাগানো যেতে পারে। মন্দিরে এখনও অনেক লোকজন আছে। আর একবার গিয়ে কারও একজোড়া নতুন জুতো নিয়ে এলে মা নিশ্চয়ই খুশি হবে৷ এই ভেবে চুপিসারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল রজত।
প্রথম চুরিতে প্রায় সবাই ধরা পড়ে৷ রজতের দশা তাই হল। কাঁচা চোরের মত ইতস্তত করে মন্দির থেকে জুতো চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল রজত। লোকজন জড়ো হয়ে গেল। ছোট ছেলে বলে রেহাই পেল না সে৷ নানা জনের নানা কটুক্তি ভেসে আসতে লাগল। কেউ বলল, "বড় হলে পাকা চোর হবে", কেউ বলল, "বাপ চাকরি করে অথচ ভালো জুতো কিনে দিতে পারে না", কেউ বলল, "বিদ্যাবুদ্ধিতে ভালো বলে শুনেছিলাম, কিন্তু এ তো চুরিবিদ্যাতেও হাত পাকিয়েছে গো"৷ অপমানে রজতের কিশোর মন বুঝতে পারল না কী করা উচিত, কী বলা উচিত, শুধু কান্নায় ভেসে গেল৷
পাড়ার পরিচিত যুবকরা ক্রন্দনরত রজতকে বাড়িতে পৌছে দিয়ে গেল৷ সব শোনার পর রজতের বাবা-মা ছেলেকে শাসন করবেন, না শান্তনা দেবেন, ভেবে পেলেন না৷ দাদু শুধু ক্রন্দনরত নাতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "কেঁদো না দাদুভাই, চলো আজই তোমাকে নতুন জুতো কিনে দেব৷"
------------------------সমাপ্ত------------------------
## স্বাধীনতা ও পরাধীনতা ##
সাম্য নামক এক কৃতী যুবকের কথা। বিবিধ বিদ্যার্জন করিয়াও সে স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা নিরুপণ করিতে পারে নাই। আপাত দৃষ্টিতে সে যাহাকে স্বাধীনতা ভাবিত, বিরুদ্ধ যুক্তিতে তাহাই পরাধীনতা বলিয়া গণ্য হইত। এরুপ পরস্পর বিরোধীতায় সাম্য নিদারুন বিচলিত হইয়া পড়িল।
সদুত্তরের প্রত্যাশায় সাম্য আসিল এক পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির কাছে। জিজ্ঞাসিল,"তুমি তো পরাধীন? পরাধীনতার কী কষ্ট আমাকে বুঝাইয়া বলো।" পাখি হাসিল, কহিল, "তোমরাই ধরো,খাঁচায় ভরো আবার মোদের নিয়ে সাহিত্য করো। ধন্য মানুষ। শোনো বলি, আমি বেশ আছি। মনিব আমার জন্য অনেক বড় খাঁচা দিয়েছে, সেখানে উড়তেও পারি। ভালো খাবার পাই। নিরাপত্তা পাই। আর কি চাই? "
ব্যর্থ মনোরথে সাম্য ফিরিয়া গেল। এক শিক্ষাগুরু সাম্যকে বলিয়াছিলেন, "সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হইলে প্রকৃত স্বাধীনতা আসিবে না। পরাধীনতার সংজ্ঞা জানিতে চাহিলে গরীবের ভগ্ন কুটিরে যাও।" সেই হেতু সাম্য তথায় গমন করিল।
কাহারও ভগ্ন কুটিরের পাশে কাহারও অট্টালিকা অট্টহাসি হাসিয়া থাকে। বন্ধু বিপ্লব কহে,"অট্টালিকা নিবাসী স্বাধীন, পুঁজিবাদী। কুটিরবাসী পরাধীন, শ্রমজীবী।" বিপ্লবকে বিশ্বাস করিয়া সাম্য নিরন্ন মানুষেরে প্রশ্ন করিল,"তোমরা কি স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়াছ?" নিরন্ন কহিল,"কে তুমি বাছা। করছো সমীক্ষা? দেবে কি দু-টাকা কেজি চাল? একটা পাকা বাড়ি? তাহলে তোমার বিপ্লবের সঙ্গে যেতে পারি।" সাম্য বুঝিল, ইহাদের স্বাধীনতা পাকা বাড়ি ও চালের সাহিত যুক্ত। ফিরিয়া চলিল সাম্য।
পথমধ্যে কতিপয় বেকারের সাহিত দেখা। সাম্য বলিল, তোমরা কি স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করিয়াছো? এম এ পাশ কহিল, "কিসের স্বাধীনতা? চার বছর ধরে, পাশ করে বসে আছি। চাকরি কই?" সাম্য বুঝিল, বেকারের স্বাধীনতা রাজার দাসত্বে লুকায়িত। কিন্তু রাজা কিরূপে সবারে দাসত্ব প্রদান করিবে? সেও কি সম্ভব? না, সেখানেও উত্তর মিলিল না।
না, এভাবে হইবে না। যথার্থ বন্দি মানুষের সম্মুখে যাইতে হইবে। জেলখানায় হাজির হইল সাম্য। তথায় দন্ডিত এক মনুষ্যের নিকট স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা জানিতে চাহিল। দন্ডিত বলিল,"স্বাধীনতা, পরাধীনতা সম্পর্কে জানতে হলে আগে রাজধর্ম জানতে হবে, রাজনীতি জানতে হবে। তবেই তুমি স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা নিরুপণ করতে পারবে।"
দন্ডিতের কথা স্যম্যের হৃদয়ে রেখাপাত করিল। সে দেখিল, স্বাধীনতা-পরাধীনতার জন্ম তো ক্ষমতা আর সম্পদের দখলদারি কেন্দ্রীক। সভ্যতার সৃষ্টিলগ্ন হইতে এক গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠীর স্বাধীনতা হরণ করিয়া চলে। পরাজিত গোষ্ঠী কখনও আবার শেকল ছিঁড়িয়া স্বাধীন হয়। অন্য গোষ্ঠী হয় পরাধীন। আদিম গোষ্ঠী জীবন থেকে রাজতন্ত্র বা বর্তমান প্রজাতন্ত্র সবেতেই, একদল স্বাধীনতা লাভের নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাইতেছে। আর একদল স্বাধীনতার উৎসব পালন করিতেছে। তাই আজ যে স্বাধীন কাল সে পরাধীন।
জেলখানার এক সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি কিরূপে ইহা অনুভব করিল? সাম্য ভাবিয়া পাইল না। পুনরায় সে জেলখানায় উপস্থিত হইল। দন্ডিতের কাছে জানিতে চাহিল আপনি কিরূপে এহেন গূঢ় তত্ব অনুধাবন করিলেন? দন্ডিত বলিল, "আদিম যুগে আমি ছিলাম, গোষ্ঠী প্রধান, মধ্যযুগে রাজা, বর্তমানে মন্ত্রী। যুগে যুগে যখন যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন তখন আমি আর আমার অনুচররা অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেছি। প্রজাদের স্বাধীনতা আইনে বেঁধেছি। আমাদের কথায় বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেয়েছে। সেই আমি বা আমরা ক্ষমতাচ্যুত হতেই কেউ আর ঘুরেও তাকায় না। আমি বন্দি, আমার অনুচররা গৃহবন্দি। তাই আমরা পরাধীন। তবে এই পরাধীনতা চিরন্তন নয়, আমরা আবার স্বাধীনতা লাভ করব, তখন শাসক হবে পরাধীন।" সব শুনিয়া সাম্য যেন দিব্যজ্ঞান লাভ করিল। ফিরিয়া গেল আপন কর্মে।
------------------------(সমাপ্ত)-------------------------
## স্মৃতিকথা ##
বলতে লজ্জা নেই, ছোটবেলায় বন্ধুরা আমায় ডাকাত 'দিপে' বলে। সেই ডাকে যতটা বক্রোক্তি ছিল তার থেকে অনেক বেশী ভালবাসা, আন্তরিকতা ছিল। আমারটা তবু চলে কিন্তু বন্ধুদের নাম আরও বিচিত্র। বাঁকা, পচা, লেউলে, খ্যাটাং, ব্যাঙ, লুটকে, ফুচকে, কেঁচো, হেগো, গুয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও কেউ বাস্তবে বাঁকা বা পচা নয় সবই ডাকনাম, আর সেই ডাকনামেই সবাই আমাদের চিনত। স্কুলের মাষ্টারমশাই ছাড়া ভালো নাম সব বাবা-মা জানতেন না!
আমাদের কফি হাউস ছিল না। ছিল ফুটবল মাঠ। যেখানে সবাই মিলিত হতাম। ফুটবল খেলতাম। গ্রামের মাষ্টারমশাই কৃষ্ণবাবু রসিক লোক, গলার স্বরে 'ভানু-জহর' মনে হত! আমাদের উৎসাহ দিতেন, সঙ্গ দিতেন। আর পুজোর সময় মাইকে প্রীতি ফুটবল খেলার ধারাবিবরণী দিতেন।
এখন বুঝতেই পারছেন সেই ধারাবিবরণী কোন পর্যায়ের হাস্যরস তৈরী করতে পারে! গ্রামের দাদা, দিদি,বৌদিরা সেই খেলা দেখতে ভীড় জমাতেন। "বাঁকা বল সোজা বক্সে...... বাধা দিচ্ছে হেগো..........পারল না ছুঁচোর কড়া ট্যাকেল............. ফাউল......... ফাউল ..........পচা ফ্রিকিক নিচ্ছে ............ ওদিকে ব্যাঙের সাথে লেগে আছে লেউল......... হাফব্যাকে নেমে এসেছে কেঁচো...........বক্সের উপর বল ভাসিয়েছে খ্যাটাং...... হেড করল ব্যাং....... গোল হতে পারে......... না..... না..... হল না... বল সোজা চলে গেল গোলকিপার গুয়ের হাতে।" এসব শুনে খেলোয়াড়, দর্শক সবাই হেসে লুটোপুটি।
কোথায় হারিয়ে গেল সেই স্মৃতি! পরিবেশটা কেমন পাল্টে যাচ্ছে। আজ দেখি খেলার মাঠ শূন্য। মোবাইল হাতে কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীরা পাশে পাশে থেকেও যেন দূরে দূরে।
------------------চলবে?
(শেষে একটু ভাববেন, তারপর হাসবেন)
## মুছে যাওয়া দিনগুলি ##
আমাদের বিদকুটে বন্ধু দলে সবচেয়ে ডানপিটে ছেলে ছিল ক্যাবলা৷ হাট্টা গোট্টা লোহা পেটানো শরীর৷ শরীরে অসুরের শক্তি। ভক্তিতে হনুমান৷ আর হনুমানের যা গুন, তখন পর্যন্ত এমন কোনও গাছের জন্ম হয়নি যেটাতে ক্যাবলা উঠতে পারত না!
দুর্গা পুজোর সময় বাড়ির টাইট একটু কম থাকে। লুজ পেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত দূর্গা মন্ডপে আড্ডা মারতাম৷ বারবার দেখতাম কেমন করে দশভূজা সেজে উঠছে, প্যান্ডেলের কী ডিজাইন হচ্ছে। তেমনই এক পুজোতে পঞ্চমীর দিন আমাদের মাথায় বদ বুদ্ধি চাপল, "চল্ ডাব চুরি করতে যাই৷" যেমন ভাবা তেমন কাজ৷ গেছো ক্যাবলাকে নিয়ে গেলাম ডাব চুরি করতে৷
জায়গাটা অন্ধকার, গাছের নিচে গুল্মের ঝোপ ঝাড়৷ এদিকে গাছের পাশেই আমাদের পরিচিত কানাইদার দোতলা বাড়ি৷ দেখলাম দোতলার জানালা হাট করে খোলা৷ ভিতরে নাইট ল্যাম্প জ্বলছে৷ ভয় হচ্ছিল কানাইদা যদি জেগে থাকে, যদি দেখে ফেলে। জানালা দিয়ে ডাবগাছের মাথাটা তো ভালভাবেই দেখা যাবে! কেউ কোনও কথা বললাম না৷ দড়ি আর কাটারি নিয়ে ক্যাবলা গাছে উঠে পড়ল। আমরা নিচে৷
বসে আছি তো বসেই আছি৷ ক্যাবলা সেই যে উঠল গাছে, আর কোনও সাড়া শব্দ নেই৷ ঘন অন্ধকারে ডাব গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে না৷ শুধু কানইদার দোতলা ঘরের নাইট ল্যাম্প হাজার ওয়াট হয়ে জ্বলছে৷ আমরা সাত-পাঁচ ভাবছি কি হল ছেলেটার? জোরে ডাকতেও পারছি না৷ এমন সময় কয়েকজন লোক গল্প করতে করতে আমাদের দিকে আসছে দেখে আমরা তো পগার পার৷ ক্যাবলা রইল গাছের মাথায়৷
দাঁড়ান, নাটক শেষ হয়নি।
দূর্গা মন্ডপে ফিরে ভাবছি ক্যাবলার কোনও বিপদ হল না তো৷ শুনেছি ডাব গাছেও সাপ টাপ থাকে। পালিয়ে আসাটা ঠিক হয়নি, আলো নিয়ে কয়েকজন বড় দাদাকে সঙ্গে করে আবার যাবো ঠিক করলাম। এমন সময় ক্যাবলা এসে হাজির! আমরা তো তাকে এই মারি, এই মারি, "শালা কতক্ষণ ধরে নীচে বসে আছি। ডাবের কাঁদি এই নামবে, এই নামবে আর, তোর শালা কোনও সাড়া শব্দ নেই৷"
তারপর সে যা বলেছিল তা আর লেখা যাবে না। শুধু এইটুকু বলি, কানাইদা ক্যাবলাকে দেখেনি। ক্যাবলা গাছে বসে দেখছিল কানাইদাকে। আর কানাইদার তখন মাস ছয়েক হল বিয়ে হয়েছে৷