## স্বাধীনতা ও পরাধীনতা ##
সাম্য নামক এক কৃতী যুবকের কথা। বিবিধ বিদ্যার্জন করিয়াও সে স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা নিরুপণ করিতে পারে নাই। আপাত দৃষ্টিতে সে যাহাকে স্বাধীনতা ভাবিত, বিরুদ্ধ যুক্তিতে তাহাই পরাধীনতা বলিয়া গণ্য হইত। এরুপ পরস্পর বিরোধীতায় সাম্য নিদারুন বিচলিত হইয়া পড়িল।
সদুত্তরের প্রত্যাশায় সাম্য আসিল এক পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির কাছে। জিজ্ঞাসিল,"তুমি তো পরাধীন? পরাধীনতার কী কষ্ট আমাকে বুঝাইয়া বলো।" পাখি হাসিল, কহিল, "তোমরাই ধরো,খাঁচায় ভরো আবার মোদের নিয়ে সাহিত্য করো। ধন্য মানুষ। শোনো বলি, আমি বেশ আছি। মনিব আমার জন্য অনেক বড় খাঁচা দিয়েছে, সেখানে উড়তেও পারি। ভালো খাবার পাই। নিরাপত্তা পাই। আর কি চাই? "
ব্যর্থ মনোরথে সাম্য ফিরিয়া গেল। এক শিক্ষাগুরু সাম্যকে বলিয়াছিলেন, "সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হইলে প্রকৃত স্বাধীনতা আসিবে না। পরাধীনতার সংজ্ঞা জানিতে চাহিলে গরীবের ভগ্ন কুটিরে যাও।" সেই হেতু সাম্য তথায় গমন করিল।
কাহারও ভগ্ন কুটিরের পাশে কাহারও অট্টালিকা অট্টহাসি হাসিয়া থাকে। বন্ধু বিপ্লব কহে,"অট্টালিকা নিবাসী স্বাধীন, পুঁজিবাদী। কুটিরবাসী পরাধীন, শ্রমজীবী।" বিপ্লবকে বিশ্বাস করিয়া সাম্য নিরন্ন মানুষেরে প্রশ্ন করিল,"তোমরা কি স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়াছ?" নিরন্ন কহিল,"কে তুমি বাছা। করছো সমীক্ষা? দেবে কি দু-টাকা কেজি চাল? একটা পাকা বাড়ি? তাহলে তোমার বিপ্লবের সঙ্গে যেতে পারি।" সাম্য বুঝিল, ইহাদের স্বাধীনতা পাকা বাড়ি ও চালের সাহিত যুক্ত। ফিরিয়া চলিল সাম্য।
পথমধ্যে কতিপয় বেকারের সাহিত দেখা। সাম্য বলিল, তোমরা কি স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করিয়াছো? এম এ পাশ কহিল, "কিসের স্বাধীনতা? চার বছর ধরে, পাশ করে বসে আছি। চাকরি কই?" সাম্য বুঝিল, বেকারের স্বাধীনতা রাজার দাসত্বে লুকায়িত। কিন্তু রাজা কিরূপে সবারে দাসত্ব প্রদান করিবে? সেও কি সম্ভব? না, সেখানেও উত্তর মিলিল না।
না, এভাবে হইবে না। যথার্থ বন্দি মানুষের সম্মুখে যাইতে হইবে। জেলখানায় হাজির হইল সাম্য। তথায় দন্ডিত এক মনুষ্যের নিকট স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা জানিতে চাহিল। দন্ডিত বলিল,"স্বাধীনতা, পরাধীনতা সম্পর্কে জানতে হলে আগে রাজধর্ম জানতে হবে, রাজনীতি জানতে হবে। তবেই তুমি স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা নিরুপণ করতে পারবে।"
দন্ডিতের কথা স্যম্যের হৃদয়ে রেখাপাত করিল। সে দেখিল, স্বাধীনতা-পরাধীনতার জন্ম তো ক্ষমতা আর সম্পদের দখলদারি কেন্দ্রীক। সভ্যতার সৃষ্টিলগ্ন হইতে এক গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠীর স্বাধীনতা হরণ করিয়া চলে। পরাজিত গোষ্ঠী কখনও আবার শেকল ছিঁড়িয়া স্বাধীন হয়। অন্য গোষ্ঠী হয় পরাধীন। আদিম গোষ্ঠী জীবন থেকে রাজতন্ত্র বা বর্তমান প্রজাতন্ত্র সবেতেই, একদল স্বাধীনতা লাভের নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাইতেছে। আর একদল স্বাধীনতার উৎসব পালন করিতেছে। তাই আজ যে স্বাধীন কাল সে পরাধীন।
জেলখানার এক সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি কিরূপে ইহা অনুভব করিল? সাম্য ভাবিয়া পাইল না। পুনরায় সে জেলখানায় উপস্থিত হইল। দন্ডিতের কাছে জানিতে চাহিল আপনি কিরূপে এহেন গূঢ় তত্ব অনুধাবন করিলেন? দন্ডিত বলিল, "আদিম যুগে আমি ছিলাম, গোষ্ঠী প্রধান, মধ্যযুগে রাজা, বর্তমানে মন্ত্রী। যুগে যুগে যখন যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন তখন আমি আর আমার অনুচররা অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেছি। প্রজাদের স্বাধীনতা আইনে বেঁধেছি। আমাদের কথায় বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেয়েছে। সেই আমি বা আমরা ক্ষমতাচ্যুত হতেই কেউ আর ঘুরেও তাকায় না। আমি বন্দি, আমার অনুচররা গৃহবন্দি। তাই আমরা পরাধীন। তবে এই পরাধীনতা চিরন্তন নয়, আমরা আবার স্বাধীনতা লাভ করব, তখন শাসক হবে পরাধীন।" সব শুনিয়া সাম্য যেন দিব্যজ্ঞান লাভ করিল। ফিরিয়া গেল আপন কর্মে।
------------------------(সমাপ্ত)-------------------------
সাম্য নামক এক কৃতী যুবকের কথা। বিবিধ বিদ্যার্জন করিয়াও সে স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা নিরুপণ করিতে পারে নাই। আপাত দৃষ্টিতে সে যাহাকে স্বাধীনতা ভাবিত, বিরুদ্ধ যুক্তিতে তাহাই পরাধীনতা বলিয়া গণ্য হইত। এরুপ পরস্পর বিরোধীতায় সাম্য নিদারুন বিচলিত হইয়া পড়িল।
সদুত্তরের প্রত্যাশায় সাম্য আসিল এক পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির কাছে। জিজ্ঞাসিল,"তুমি তো পরাধীন? পরাধীনতার কী কষ্ট আমাকে বুঝাইয়া বলো।" পাখি হাসিল, কহিল, "তোমরাই ধরো,খাঁচায় ভরো আবার মোদের নিয়ে সাহিত্য করো। ধন্য মানুষ। শোনো বলি, আমি বেশ আছি। মনিব আমার জন্য অনেক বড় খাঁচা দিয়েছে, সেখানে উড়তেও পারি। ভালো খাবার পাই। নিরাপত্তা পাই। আর কি চাই? "
ব্যর্থ মনোরথে সাম্য ফিরিয়া গেল। এক শিক্ষাগুরু সাম্যকে বলিয়াছিলেন, "সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হইলে প্রকৃত স্বাধীনতা আসিবে না। পরাধীনতার সংজ্ঞা জানিতে চাহিলে গরীবের ভগ্ন কুটিরে যাও।" সেই হেতু সাম্য তথায় গমন করিল।
কাহারও ভগ্ন কুটিরের পাশে কাহারও অট্টালিকা অট্টহাসি হাসিয়া থাকে। বন্ধু বিপ্লব কহে,"অট্টালিকা নিবাসী স্বাধীন, পুঁজিবাদী। কুটিরবাসী পরাধীন, শ্রমজীবী।" বিপ্লবকে বিশ্বাস করিয়া সাম্য নিরন্ন মানুষেরে প্রশ্ন করিল,"তোমরা কি স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়াছ?" নিরন্ন কহিল,"কে তুমি বাছা। করছো সমীক্ষা? দেবে কি দু-টাকা কেজি চাল? একটা পাকা বাড়ি? তাহলে তোমার বিপ্লবের সঙ্গে যেতে পারি।" সাম্য বুঝিল, ইহাদের স্বাধীনতা পাকা বাড়ি ও চালের সাহিত যুক্ত। ফিরিয়া চলিল সাম্য।
পথমধ্যে কতিপয় বেকারের সাহিত দেখা। সাম্য বলিল, তোমরা কি স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করিয়াছো? এম এ পাশ কহিল, "কিসের স্বাধীনতা? চার বছর ধরে, পাশ করে বসে আছি। চাকরি কই?" সাম্য বুঝিল, বেকারের স্বাধীনতা রাজার দাসত্বে লুকায়িত। কিন্তু রাজা কিরূপে সবারে দাসত্ব প্রদান করিবে? সেও কি সম্ভব? না, সেখানেও উত্তর মিলিল না।
না, এভাবে হইবে না। যথার্থ বন্দি মানুষের সম্মুখে যাইতে হইবে। জেলখানায় হাজির হইল সাম্য। তথায় দন্ডিত এক মনুষ্যের নিকট স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা জানিতে চাহিল। দন্ডিত বলিল,"স্বাধীনতা, পরাধীনতা সম্পর্কে জানতে হলে আগে রাজধর্ম জানতে হবে, রাজনীতি জানতে হবে। তবেই তুমি স্বাধীনতা-পরাধীনতার সংজ্ঞা নিরুপণ করতে পারবে।"
দন্ডিতের কথা স্যম্যের হৃদয়ে রেখাপাত করিল। সে দেখিল, স্বাধীনতা-পরাধীনতার জন্ম তো ক্ষমতা আর সম্পদের দখলদারি কেন্দ্রীক। সভ্যতার সৃষ্টিলগ্ন হইতে এক গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠীর স্বাধীনতা হরণ করিয়া চলে। পরাজিত গোষ্ঠী কখনও আবার শেকল ছিঁড়িয়া স্বাধীন হয়। অন্য গোষ্ঠী হয় পরাধীন। আদিম গোষ্ঠী জীবন থেকে রাজতন্ত্র বা বর্তমান প্রজাতন্ত্র সবেতেই, একদল স্বাধীনতা লাভের নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাইতেছে। আর একদল স্বাধীনতার উৎসব পালন করিতেছে। তাই আজ যে স্বাধীন কাল সে পরাধীন।
জেলখানার এক সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি কিরূপে ইহা অনুভব করিল? সাম্য ভাবিয়া পাইল না। পুনরায় সে জেলখানায় উপস্থিত হইল। দন্ডিতের কাছে জানিতে চাহিল আপনি কিরূপে এহেন গূঢ় তত্ব অনুধাবন করিলেন? দন্ডিত বলিল, "আদিম যুগে আমি ছিলাম, গোষ্ঠী প্রধান, মধ্যযুগে রাজা, বর্তমানে মন্ত্রী। যুগে যুগে যখন যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন তখন আমি আর আমার অনুচররা অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেছি। প্রজাদের স্বাধীনতা আইনে বেঁধেছি। আমাদের কথায় বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেয়েছে। সেই আমি বা আমরা ক্ষমতাচ্যুত হতেই কেউ আর ঘুরেও তাকায় না। আমি বন্দি, আমার অনুচররা গৃহবন্দি। তাই আমরা পরাধীন। তবে এই পরাধীনতা চিরন্তন নয়, আমরা আবার স্বাধীনতা লাভ করব, তখন শাসক হবে পরাধীন।" সব শুনিয়া সাম্য যেন দিব্যজ্ঞান লাভ করিল। ফিরিয়া গেল আপন কর্মে।
------------------------(সমাপ্ত)-------------------------
No comments:
Post a Comment