(বড় হলেও এক নিঃশ্বাসে পড়া যাবে। হৃদয় ছুঁলে বোলো / বলবেন)
## ভগবান ##
বেশকিছুদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছে শ্যামল৷ সহধর্মীনি বারবার বলছে,"একবার বড় ডাক্তার দেখিয়ে এসো" অথচ শ্যামলের হেলদোল নেই৷ তবে সেটা স্বভাবে নয়। অভাবে। একবার বড় ডাক্তারের কাছে গেলে কত খরচ সেটা শ্যামল ভালো করেই জানে। অথচ রোজগার বলতে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মূল্য ছাড়া আর কিছু নেই ।
শেষমেষ পারল না শ্যামল, চোখদুটো খুব জ্বালা করছে৷ দেখতেও সমস্যা হচ্ছে৷ এবার ডাক্তার না দেখালেই নয়৷ খোঁজ নিয়ে জানতে পারল তারই বাল্যবন্ধু অনিন্দ্য এখন কাছের শহরে চেম্বার করছে৷ শ্যামলের মনটা খুশিতে ভরে উঠল৷ কতদিন অনিন্দ্যর সাথে দেখা হয়নি৷ মাধ্যমিক পর্যন্ত একসাথে পড়াশোনা করেছিল ওরা। তবে লেখাপড়ায় অনিন্দ্যর ধারে কাছে ছিল না শ্যামল৷ তবু ওদের বন্ধুত্ব ছিল। কারণ কিশোর বয়স জানে না মেধা, অর্থ ও যশের ভেদাভেদ। সেখানে শুধুই হৃদয় আর আবেগ।
রাতে বাড়ি ফিরে শ্যামল বউ কে বলল, "কালকেই চোখের ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি, আর জানো, সে ডাক্তার আমার ছোট বেলার বন্ধু৷" সর্বশিক্ষায় পাশ শ্যামলের গৃহীনি ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল,"কবে থেকে বলছি, হুঁশ নেই, চোখের বারোটা বেজে গেল, তারপর ডাক্তার৷" শ্যামল বলল, "তুমি জানো না, অনিন্দ্য কত বড় ডাক্তার, পঞ্চা জেঠু বলছিল ওর হাতে পড়লে দু-দিনেই সেরে যাবে৷ দেশ বিদেশ থেকে ওর ডাক পড়ে৷ নির্ঘাত গ্রামের স্মৃতি ভুলতে পারেনি বলে এখানে আসে৷ তাছাড়া তুমি দেখবে, অনিন্দ্য আমাকে দেখলে আর ছাড়তেই চাইবে না৷ পয়সাকড়ি দুরের কথা, ঔষধপত্রও দিয়ে দেবে৷" "ঐ আশায় থাকো, তারপর দেখবে তোমাকে চিনতেই পারবে না৷ ঝাঁটামারি বন্ধুত্বের, কত দেখলুম৷ পয়সাকড়ি যা লাগে লাগুক আগে চোখটা ভালো করো ৷" কঠিন কথাগুলো সহজেই বলে গজগজ করতে লাগল শ্যামলের গৃহীনি।
পরদিন সকালেই গেল শ্যামল৷ চেম্বারে যখন পৌছাল তখন ৭-০০ টা বেজে গেছে৷ ডাক্তার আসবেন ৯-০০ টায়৷ দু-এক জন ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে৷ নাম লিখাতে গিয়ে ধাক্কা খেল শ্যামল৷ ৭০ নম্বরে তার নাম৷ শ্যামল ভেবেছিল অনিন্দ্য হয়ত তার ফীজটা নেবে না৷ কিন্তু কড়কড়ে ২০০ টাকা দিতে তবে নাম লিখেছে ডাক্তারের চ্যালা চামুন্ডরা৷ কী দেমাক তাদের, ভাবখানা এমন- ইচ্ছা হলে থাকুন না হলে কেটে পড়ুন৷
চেম্বারের বাইরে বসে এই অপমানটা হজম করছিল শ্যামল৷ ব্যাটারা যদি জানত শ্যামল কে, তাহলে...........৷ চেম্বারে ঢোকার দরজায় নেমপ্লেট, সেখানে বড় বড় করে লেখা, ডাঃ অনিন্দ্য রায়, এম বি বি এস (এম.এস)৷ শ্যামলের মনে পড়তে লাগল স্কুল জীবনের কথা৷ অনিন্দ্যর জন্য সেকেন্ড বেঞ্চের ধারে নিয়মিত জায়গা রাখত সে৷ গাছের সবথেকে বড় বড় পেয়ারা মাকে লুকিয়ে স্কুলে নিয়ে আসত, শুধু অনিন্দ্যকে দেবে বলে৷ ভালো খেলতে পারত না অনিন্দ্য, তবু স্কুলের খেলায় অনিন্দ্যর নাম থাকত৷ কারন লিষ্টটা তৈরী করত শ্যামল৷ সে জানত অনিন্দ্য পারবে না, তবে অনিন্দ্যর খামতি সে নিজে পূরণ করে দেবে৷ কারণ খেলাধুলায় শ্যামল ছিল স্কুলের সেরা৷
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন ৯টা বেজে গেছে৷ লোকজন গিজগিজ করছে৷ বসার জায়গা সীমিত, বেশীরভাগ লোক দাঁড়িয়ে৷ ডাঃ রায় গাড়ি থেকে নেমে শশব্যস্ত হয়ে চেম্বারে ঢুকলেন৷ ডাক্তারের চ্যালা চামুন্ডরা ততধিক ব্যস্ততার ভান দেখিয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে লাগল৷ ভীড়ের মাঝে অনিন্দ্যকে ভাল করে দেখতেই পেল না শ্যামল।
৭০ নম্বরে নাম৷ কখন যে হবে ঠিক নেই ৷ সকালে মুড়ি খেয়েছিল শ্যামল৷ ভেবেছিল বাড়ি ফিরে ভাত খাবে কিন্তু যা অবস্থা তাতে কখন ডাক্তার দেখানো হবে তারই ঠিক নেই৷ তবু ধৈর্য্য ধরে বসে থাকল সে৷ কতদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা হবে। সে তখন নিখাদ বন্ধুত্বের সুখস্মৃতিতে আচ্ছন্ন। তবে মাধ্যমিকের পর ওদের এক বেঞ্চে বসা হয়নি৷ কারন অনিন্দ্য বিজ্ঞানে আর শ্যামল কলাবিভাগে৷ তবু ওদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল৷ সেবার শুধু অনিন্দ্যর জন্যই বিজ্ঞান বনাম কলাবিভাগের খেলায় ইচ্ছা করে গোল মিস্ করেছিল শ্যামল। যাতে অনিন্দ্যর বিজ্ঞান বিভাগ জিততে পারে।
প্রায় দুটো বেজে গেছে, ডাক পড়ল ৭০ নম্বরের৷ জীবনে প্রথাম এ সি ঘরে ঢুকল শ্যামল৷ ডাক্তারের কাছে পৌছানোর আগে সহকারীরা চোখ পরীক্ষা করলেন। শ্যামল ভাবছে, অনিন্দ্যকে তুই বলবে না আপনি বলবে? চল্লিশের রংচটা বৃদ্ধসুলভ যুবক ডাক্তারকে তুই বললে ডাক্তারের সম্মানহানী হতে পারে। এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অনিন্দ্যর মুখোমুখি হল শ্যামল। দেখল, এ কোন অনিন্দ্য! চেহারা পুরো পাল্টে গেছে! শ্যামলা রংয়ের ছেলেটা আজ গৌরবর্ণ হয়েছে! শ্যামল কিছু বলার আগেই অনিন্দ্য বলল, "বলুন কি সমস্যা হচ্ছে?" ইতস্তত করে সমস্যার কথা বলল শ্যামল, যন্ত্র দিয়ে খুব দ্রুত শ্যামলের চোখ দেখেই খচ খচ করে প্রেসক্রিপশন লিখে দিল ডাক্তার অনিন্দ্য। ডাক্তারের সহকারী বলল,"আসুন আসুন বাইরে আসুন৷" কিছু বলতে যাচ্ছিল শ্যামল, কিন্তু পরের রোগী দরজায় দাঁড়িয়ে৷ সে আর দাঁড়াতে পারল না৷ বেরিয়ে এল৷ ড়াক্তারের সহকারী তাকে বুঝিয়ে বলল ডাক্তাবাবু প্রেসক্রিপশানে কি লিখেছেন৷
বিমর্ষ মনে বাড়ি ফিরল শ্যামল৷ মাথা ঘুরছে। সহধর্মীনিকে বলল,"তাড়াতাড়ি খেতে দাও, খুব খিদে পেয়েছে৷"এক্ষুনি দিচ্ছি কিন্তু ডাক্তার কি বলল, বন্ধু তোমায় চিনতে পেরেছিল তো? শ্যামল কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না, শুধু বলল "চিন্তা কোরো না, ভগবান আছে, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
## ভগবান ##
বেশকিছুদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছে শ্যামল৷ সহধর্মীনি বারবার বলছে,"একবার বড় ডাক্তার দেখিয়ে এসো" অথচ শ্যামলের হেলদোল নেই৷ তবে সেটা স্বভাবে নয়। অভাবে। একবার বড় ডাক্তারের কাছে গেলে কত খরচ সেটা শ্যামল ভালো করেই জানে। অথচ রোজগার বলতে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মূল্য ছাড়া আর কিছু নেই ।
শেষমেষ পারল না শ্যামল, চোখদুটো খুব জ্বালা করছে৷ দেখতেও সমস্যা হচ্ছে৷ এবার ডাক্তার না দেখালেই নয়৷ খোঁজ নিয়ে জানতে পারল তারই বাল্যবন্ধু অনিন্দ্য এখন কাছের শহরে চেম্বার করছে৷ শ্যামলের মনটা খুশিতে ভরে উঠল৷ কতদিন অনিন্দ্যর সাথে দেখা হয়নি৷ মাধ্যমিক পর্যন্ত একসাথে পড়াশোনা করেছিল ওরা। তবে লেখাপড়ায় অনিন্দ্যর ধারে কাছে ছিল না শ্যামল৷ তবু ওদের বন্ধুত্ব ছিল। কারণ কিশোর বয়স জানে না মেধা, অর্থ ও যশের ভেদাভেদ। সেখানে শুধুই হৃদয় আর আবেগ।
রাতে বাড়ি ফিরে শ্যামল বউ কে বলল, "কালকেই চোখের ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি, আর জানো, সে ডাক্তার আমার ছোট বেলার বন্ধু৷" সর্বশিক্ষায় পাশ শ্যামলের গৃহীনি ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল,"কবে থেকে বলছি, হুঁশ নেই, চোখের বারোটা বেজে গেল, তারপর ডাক্তার৷" শ্যামল বলল, "তুমি জানো না, অনিন্দ্য কত বড় ডাক্তার, পঞ্চা জেঠু বলছিল ওর হাতে পড়লে দু-দিনেই সেরে যাবে৷ দেশ বিদেশ থেকে ওর ডাক পড়ে৷ নির্ঘাত গ্রামের স্মৃতি ভুলতে পারেনি বলে এখানে আসে৷ তাছাড়া তুমি দেখবে, অনিন্দ্য আমাকে দেখলে আর ছাড়তেই চাইবে না৷ পয়সাকড়ি দুরের কথা, ঔষধপত্রও দিয়ে দেবে৷" "ঐ আশায় থাকো, তারপর দেখবে তোমাকে চিনতেই পারবে না৷ ঝাঁটামারি বন্ধুত্বের, কত দেখলুম৷ পয়সাকড়ি যা লাগে লাগুক আগে চোখটা ভালো করো ৷" কঠিন কথাগুলো সহজেই বলে গজগজ করতে লাগল শ্যামলের গৃহীনি।
পরদিন সকালেই গেল শ্যামল৷ চেম্বারে যখন পৌছাল তখন ৭-০০ টা বেজে গেছে৷ ডাক্তার আসবেন ৯-০০ টায়৷ দু-এক জন ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে৷ নাম লিখাতে গিয়ে ধাক্কা খেল শ্যামল৷ ৭০ নম্বরে তার নাম৷ শ্যামল ভেবেছিল অনিন্দ্য হয়ত তার ফীজটা নেবে না৷ কিন্তু কড়কড়ে ২০০ টাকা দিতে তবে নাম লিখেছে ডাক্তারের চ্যালা চামুন্ডরা৷ কী দেমাক তাদের, ভাবখানা এমন- ইচ্ছা হলে থাকুন না হলে কেটে পড়ুন৷
চেম্বারের বাইরে বসে এই অপমানটা হজম করছিল শ্যামল৷ ব্যাটারা যদি জানত শ্যামল কে, তাহলে...........৷ চেম্বারে ঢোকার দরজায় নেমপ্লেট, সেখানে বড় বড় করে লেখা, ডাঃ অনিন্দ্য রায়, এম বি বি এস (এম.এস)৷ শ্যামলের মনে পড়তে লাগল স্কুল জীবনের কথা৷ অনিন্দ্যর জন্য সেকেন্ড বেঞ্চের ধারে নিয়মিত জায়গা রাখত সে৷ গাছের সবথেকে বড় বড় পেয়ারা মাকে লুকিয়ে স্কুলে নিয়ে আসত, শুধু অনিন্দ্যকে দেবে বলে৷ ভালো খেলতে পারত না অনিন্দ্য, তবু স্কুলের খেলায় অনিন্দ্যর নাম থাকত৷ কারন লিষ্টটা তৈরী করত শ্যামল৷ সে জানত অনিন্দ্য পারবে না, তবে অনিন্দ্যর খামতি সে নিজে পূরণ করে দেবে৷ কারণ খেলাধুলায় শ্যামল ছিল স্কুলের সেরা৷
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন ৯টা বেজে গেছে৷ লোকজন গিজগিজ করছে৷ বসার জায়গা সীমিত, বেশীরভাগ লোক দাঁড়িয়ে৷ ডাঃ রায় গাড়ি থেকে নেমে শশব্যস্ত হয়ে চেম্বারে ঢুকলেন৷ ডাক্তারের চ্যালা চামুন্ডরা ততধিক ব্যস্ততার ভান দেখিয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে লাগল৷ ভীড়ের মাঝে অনিন্দ্যকে ভাল করে দেখতেই পেল না শ্যামল।
৭০ নম্বরে নাম৷ কখন যে হবে ঠিক নেই ৷ সকালে মুড়ি খেয়েছিল শ্যামল৷ ভেবেছিল বাড়ি ফিরে ভাত খাবে কিন্তু যা অবস্থা তাতে কখন ডাক্তার দেখানো হবে তারই ঠিক নেই৷ তবু ধৈর্য্য ধরে বসে থাকল সে৷ কতদিন পর বন্ধুর সাথে দেখা হবে। সে তখন নিখাদ বন্ধুত্বের সুখস্মৃতিতে আচ্ছন্ন। তবে মাধ্যমিকের পর ওদের এক বেঞ্চে বসা হয়নি৷ কারন অনিন্দ্য বিজ্ঞানে আর শ্যামল কলাবিভাগে৷ তবু ওদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল৷ সেবার শুধু অনিন্দ্যর জন্যই বিজ্ঞান বনাম কলাবিভাগের খেলায় ইচ্ছা করে গোল মিস্ করেছিল শ্যামল। যাতে অনিন্দ্যর বিজ্ঞান বিভাগ জিততে পারে।
প্রায় দুটো বেজে গেছে, ডাক পড়ল ৭০ নম্বরের৷ জীবনে প্রথাম এ সি ঘরে ঢুকল শ্যামল৷ ডাক্তারের কাছে পৌছানোর আগে সহকারীরা চোখ পরীক্ষা করলেন। শ্যামল ভাবছে, অনিন্দ্যকে তুই বলবে না আপনি বলবে? চল্লিশের রংচটা বৃদ্ধসুলভ যুবক ডাক্তারকে তুই বললে ডাক্তারের সম্মানহানী হতে পারে। এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অনিন্দ্যর মুখোমুখি হল শ্যামল। দেখল, এ কোন অনিন্দ্য! চেহারা পুরো পাল্টে গেছে! শ্যামলা রংয়ের ছেলেটা আজ গৌরবর্ণ হয়েছে! শ্যামল কিছু বলার আগেই অনিন্দ্য বলল, "বলুন কি সমস্যা হচ্ছে?" ইতস্তত করে সমস্যার কথা বলল শ্যামল, যন্ত্র দিয়ে খুব দ্রুত শ্যামলের চোখ দেখেই খচ খচ করে প্রেসক্রিপশন লিখে দিল ডাক্তার অনিন্দ্য। ডাক্তারের সহকারী বলল,"আসুন আসুন বাইরে আসুন৷" কিছু বলতে যাচ্ছিল শ্যামল, কিন্তু পরের রোগী দরজায় দাঁড়িয়ে৷ সে আর দাঁড়াতে পারল না৷ বেরিয়ে এল৷ ড়াক্তারের সহকারী তাকে বুঝিয়ে বলল ডাক্তাবাবু প্রেসক্রিপশানে কি লিখেছেন৷
বিমর্ষ মনে বাড়ি ফিরল শ্যামল৷ মাথা ঘুরছে। সহধর্মীনিকে বলল,"তাড়াতাড়ি খেতে দাও, খুব খিদে পেয়েছে৷"এক্ষুনি দিচ্ছি কিন্তু ডাক্তার কি বলল, বন্ধু তোমায় চিনতে পেরেছিল তো? শ্যামল কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না, শুধু বলল "চিন্তা কোরো না, ভগবান আছে, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
No comments:
Post a Comment