Tuesday, 18 September 2018

(দেখুন তো, ঠিকঠাক লিখতে পারছি কি না? )
## রজতের শিক্ষালাভ ##
গৃহবাসী হয়েও বনবাসী বিকাশবাবু৷ তবে সে বনবাস, ইঁট পাথরের জঙ্গলে এক সুখের নিবাস৷ নিজে সরকারি চাকুরে। নীলমনি বৌ-নিয়ে সেখানে নিশিযাপন করেন। আর আছে ছেলে। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার আগে বিকাশবাবু মহামূল্যবান দুটো জিনিস বেকার ভাই এর হাতে দিয়ে এসেছেন, সেটা হল বাবা-মা৷ গ্রামে নাকি পড়াশোনার পরিবেশ নেই, সুযোগ সুবিধা নেই। তাই এই বনবাস।
বিকাশবাবু জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন, তাঁর বাবা যদি তাকে দামী টিউশন দিতেন, নামী স্কুলে ভর্তি করতেন, হরলিক্স কমপ্লানের বিজ্ঞাপন দেখতেন, তাহলে তিনি আর একটা আব্দুল কালাম হতে পারতেন। নিজের ছেলের ক্ষেত্রে সে ভুল তিনি করতে চান না৷
এহেন বিকাশবাবুর ছেলে রজত এখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে৷ ঘুম ভেঙে পিডিয়াসিওর খেয়ে রজতের পড়া শুরু৷ গুরু আসেন ছাত্রগৃহে৷ শুধু অংক, ইংরাজী নয়, সমস্ত বিষয়ে তার দীক্ষা লাভের গুরু আছে৷ রীতিমত গোয়েন্দাগিরি করে রজতের গুরুকুল তৈরী করেছেন বিকাশবাবু৷ ছেলে না পারলে গুলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা রেখেছেন তিনি৷
বাবা-মা’র বেঁধে দেওয়া ছকে কিশোর রজত হামাগুড়ি দেয়৷ খেলার সময় নাই। যদি পাওয়া যায়, সেও মায়ের পাহারায়৷ জোরে ছুটবে না, ফুটবল খেলবে না, ঠেলাঠেলি করবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি আইন৷ যদি আছাড় খায়, যদি ছিঁড়ে যায়! তাহলে ছেলের যতটা জ্বালা করে মা-বাবার তার থেকে বেশী ফাটে৷ ছোট্ট রজত ভাবে এটাই জীবন৷ বাবা-মার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলাই ছোটদের কাজ৷ বাবা-মা বলেছেন, "কটা তো বছর, কষ্ট করে পড়াশোনা করলে ভবিষ্যতে সুখ'ই সুখ!" তখন সে "প্লেনে চড়তে পারবে, ফোর্ড-বোলেরো নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবে, বিদেশে হনিমুনে যেতে পারবে!" রজত তাই মন দিয়ে পড়াশোনা করে৷ বাবা-মার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে৷ ক্লাসে ভালো রেজাল্টও করে৷ বিকাশবাবু দেখেন, তাঁর স্বপ্নের রথ কেমন তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে৷
রজতের গুরুকুল রজতকে গুরুমারা বিদ্যা শেখান! আর রজতের মা রজতকে শেখান স্বজনহারা বিদ্যা! তাই রজত ভালো করে জানে না, কে তার পিসি, কে তার মাসী, কে তার কাকু-কাকিমা, আর কত ভালবাসে দাদু ঠাকুমা। এরই মধ্যে নিয়ম করে রজতকে নীতি শিক্ষার পাঠ দেন তার বাবা-মা। ভূবনের গল্পের উদাহরণ দিয়ে বলেন, "না বলিয়া কখনও পরের দ্রব্যে হাত দেবে না, কদাচ মিথ্যা কথা বলিবে না... চুরি করা মহাপাপ...." ইত্যাদি ইত্যাদি।
রজত ছেলেটা বড্ড লাজুক। আসলে জন্মের পর সে কোনদিন নেংটু থাকেনি। অট্টহাসি হাসি হাসেনি। মা বাধা দেন। আনন্দ চিৎকারে শাসন করেন। কাঁদলে বলেন,"মেয়েদের মত কাঁদবে না।" "বেশী খাবে না।" "কম খাবে না।" "এদিকে তাকাবে না।" "ওদিকে তাকাবে না।" আরো কতশত "না" আছে, সব বলা যাবে না।
রজতদের বাড়ির কাছাকাছি এক মন্দিরে সেদিন বাৎসরিক পুজো। মহা সমারোহ।গ্রামের বাড়ি থেকে রজতের দাদু-ঠাকুমা এসেছেন। পাড়ায় উৎসবের মেজাজ। রজত মা এর কাছে আব্দার করল পাড়ার বন্ধুদের সাথে ঠাকুর দেখতে যাবে। মা বললেন, "যাও তবে বেশী দেরী করবে না।" বাঁধন ছেঁড়ার আনন্দে রজত নতুন পোষাক পরিধান করে পুজো দেখতে গেল।
ঠাকুর দেখে বিষন্ন মনে বাড়ি ফিরল রজত। মা জিজ্ঞাসা করলেন, "কী হয়েছে? মুখখানা ভার কেন? কাঁদো কাঁদো স্বরে রজত বলল,"জুতো খুলে মন্দিরে ঢুকেছিলাম, বাইরে বেরিয়ে দেখি জুতো জোড়া নেই।" ব্যস, তুবড়িতে আগুন লাগল। কর্কশ কন্ঠে মা বলতে লাগলেন,"এই সেদিন বাটা'র শোরুম থেকে কিনলাম, এরই মধ্যে চোরের পেট ভরিয়ে চলে এসেছ! আর কিনে দিতে পারব না। ঐ চপ্পল পায়ে সব জায়গা যাবে বোকা, অকর্মন্য। নিজের জিনিস সামলে রাখতে পারে না৷ এভাবে চললে সারাজীবন লোক ঠকিয়েই যাবে, কিচ্ছু করতে পারবে না৷" চিৎকার শুনে বেরিয়ে এসে রজতের দাদু বললেন" আহা, ওভাবে বকাবকি করছ কেন বৌমা, কেউ যদি নিয়ে চলে যায় ও কি করবে?" " কি করবে? কেন? একটু বুদ্ধি খরচ করে ও কারও জুতো নিয়ে আসতে পারল না।" বৌমার এই কথায় বিস্মিত শ্বশুর বললেন, "এমন বলতে নেই বৌমা, ও ভুল শিক্ষা পাবে।" "আপনাদের যুগ চলে গেছে বাবা, বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে পদে পদে ঠকতে হবে৷" বৌমার যুক্তিতে হার মানলেন বৃদ্ধ শ্বশুর৷ চুপ করে গেলেন৷ ক্রন্দনরত নাতিকে শান্তনা দিতে দিতে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন৷
ব্যাপারটা ছাইচাপা আগুনের মত আপাত শান্ত হয়ে গেছে, বাড়ির সবাই দিবানিদ্রায় মগ্ন৷ শুধু রজতের চোখে ঘুম নেই, মায়ের কথা শুনে সে ভাবছে, এটা কেমন নিয়ম, চুরি করা মহাপাপ আবার চুরি করতে না পারলে বোকা, অকর্মন্য! কিন্তু চুরি করা তো অন্যায়৷ তবে কি অন্যায়টাই নিয়ম? কিশোর মন অঙ্কটা বুঝতে পারল না৷ তবে মায়ের বুদ্ধিটা তার দারুণ লেগেছে, কিন্তু তার মাথায় কেন এল না? নিজেকে সত্যিই বড্ড বোকা লাগছে তার৷
রজতের হঠাৎই মনে হল মায়ের বুদ্ধিটা তো এখনও কাজে লাগানো যেতে পারে। মন্দিরে এখনও অনেক লোকজন আছে। আর একবার গিয়ে কারও একজোড়া নতুন জুতো নিয়ে এলে মা নিশ্চয়ই খুশি হবে৷ এই ভেবে চুপিসারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল রজত।
প্রথম চুরিতে প্রায় সবাই ধরা পড়ে৷ রজতের দশা তাই হল। কাঁচা চোরের মত ইতস্তত করে মন্দির থেকে জুতো চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল রজত। লোকজন জড়ো হয়ে গেল। ছোট ছেলে বলে রেহাই পেল না সে৷ নানা জনের নানা কটুক্তি ভেসে আসতে লাগল। কেউ বলল, "বড় হলে পাকা চোর হবে", কেউ বলল, "বাপ চাকরি করে অথচ ভালো জুতো কিনে দিতে পারে না", কেউ বলল, "বিদ্যাবুদ্ধিতে ভালো বলে শুনেছিলাম, কিন্তু এ তো চুরিবিদ্যাতেও হাত পাকিয়েছে গো"৷ অপমানে রজতের কিশোর মন বুঝতে পারল না কী করা উচিত, কী বলা উচিত, শুধু কান্নায় ভেসে গেল৷
পাড়ার পরিচিত যুবকরা ক্রন্দনরত রজতকে বাড়িতে পৌছে দিয়ে গেল৷ সব শোনার পর রজতের বাবা-মা ছেলেকে শাসন করবেন, না শান্তনা দেবেন, ভেবে পেলেন না৷ দাদু শুধু ক্রন্দনরত নাতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "কেঁদো না দাদুভাই, চলো আজই তোমাকে নতুন জুতো কিনে দেব৷"
------------------------সমাপ্ত------------------------

No comments:

Post a Comment