রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের ফটিককে মনে আছে? ফটিকের মামা বিশ্বম্ভরবাবু ফটিককে গ্রাম থেকে শহরে নিয়ে গিয়েছিলেন লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার জন্য৷ ফটিকের বাবা ছিল না, গ্রামে সমবয়সি ছেলেদের মারধোর, সারাদিন টো টো করে ঘুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, মায়ের কথা অমান্য করা ইত্যাদি, ইত্যাদি নানা বদগুন ফটিকের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ছিল৷ মামার বাড়িতে মামীর স্নেহহীনতা এই গল্পের করুন পরিণতি ৷
ভাবছেন আমি আবার এই গল্প কাহিনী বলছি কেন৷ তাহলে পড়ুন নতুন ফটিকের কাহিনি।
ছুটি গল্পের ফটিকের মতই রাইপুর গ্রামের এক ফটিক ছিল৷ তারও বাবা অল্পবয়সে রোগভোগে মারা যায়৷ আনাথিনী মা ফটিককে মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল শুধু অন্ন জোগাতে পারবে না বলে৷ এই ফটিক পড়াশোনায় ভালো৷ গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে প্রথম হয়৷ শিক্ষক মহাশয়রা খুব ভালোবাসেন৷ মামা বাড়ি যেতে মন না চাইলেও অভাবের তাড়নায় তাকে যেতেই হয়েছিল৷ মামাও ছিলেন নিঃস্তান৷ তাই মামা-মামী তাকে সাদরেই গ্রহণ করেছিলেন।
এরপর শহরের স্কুল৷ গাছপালা ঘেরা সবুজ গ্রাম ছেড়ে ফটিক শহরের ইঁট-পাথরের জঙ্গলে৷ মামা-মামী শিক্ষিত৷ ফটিকের শিক্ষালাভের আয়োজনে কোনও ত্রুটি রাখলেন না৷ সকালে টিউশন, তারপর স্কুল, ফিরে এসে কোনও দিন অঙ্কন, কোনও দিন গান-বাজনা, সন্ধ্যায় টিউশন৷ রাত্রিতে মামীমার কাছে পড়তে বসা৷ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া আবার সকাল হতেই টিউশন৷ বিষয়ভিত্তিক বই ছাড়াও, কোশ্চেন ব্যাঙ্ক, জেনারেল নলেজ, গ্রামার ইত্যাদি ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২০টা বই তার৷
ফটিকের দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল৷ খেলার মাঠও নেই, সঙ্গীও নেই৷ নেই সেই ঘুড়ি ওড়ানো, নেই ঘোষেদের গাছে আম পাড়তে যাওয়া৷ রবিবার বড়পুকুরে ঘন্টাখানেক ধরে সাঁতার খেলা৷
স্কুলেও তার বিশেষ সঙ্গীসাথী গড়ে উঠল না৷ শহরের বন্ধুদের সাথে সে মানিয়ে নিতে পারছে না৷ রাত্রিবেলা শুতে গিয়ে তার মনে পড়ে গ্রামের মাখনদের কথা৷ জমি থেকে আলু বের করে জ্বালানী যোগাড় করে পুড়িয়ে খাওয়ার কথা৷ আমছিঁচকা রোদে দিয়ে বসে থাকা৷ বাড়ির পাশে গাছে শালিক পাখির বাসায় গিয়ে ডিম দেখে আসা৷ রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, নজরুলের জন্মদিনে ভোরবেলা জঙ্গল থেকে ফুল তুলে মালা গেঁথে নিয়ে যাওয়া । বোঁদে খাওয়ার জন্য লাইনে হুড়োহুড়ি করা। আরও কত কি৷ এখানে ওসব কিছুই করতে হয় না। বরং ছুটির দিনে টিউশন বেশি থাকে। মামী বলে, ফালতু সময় নষ্ট করবে না। দিনে দিনে ফটিক যেন খাঁচার তোতাপাখি হয়ে গেল৷
স্কুলের প্রথম পরীক্ষার ফল বের হল৷ প্রথম হতে পারে নি, কিন্তু সে ভালো নম্বরই পেয়েছিল৷ মামী বলল আরোও বেশী বেশী করে পড়তে হবে৷ আরো মনোযোগ দিতে হবে৷ ইংরাজীতে কম নম্বর হওয়ার জন্য আবার একটা ইংরাজী শিক্ষক রাখা হল৷ ফটিকের শিশুকাল কেড়ে নিয়ে মামা-মামী ভবিষ্যত গড়তে চাইছেন৷
সেদিন ফটিকের মা ছেলেকে দেখতে এল৷ রাত্রিতে মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ফটিক মা কে বলল, মা আমার এখানে ভালো লাগছে না৷ তুমি আমাকে ফিরে নিয়ে চলো৷ মা তাকে বোঝাবার চেষ্টা করল গ্রামে থাকলে ফটিককে সে ভালো করে খেতে পর্য়ন্ত দিতে পারবে না৷ তার ওপর পড়াশোনা, শখ আহ্লাদ কি করে সে মেটাবে সে ? তাছাড়া মামা-মামীতো তোকে ভালোই বাসে৷ ফটিক কিছু বলল না কিন্তু সে ভালোবাসার ঠেলায় তার শিশুমনে কি হচ্ছে সেটা কেউ বুঝতে চাইল না৷ দু-একদিন থেকে মা যেদিন ফটিককে ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেল সেদিন ফটিকের দুচোখ দিয়ে শ্রাবণের ধারা ঝরে গেল৷
এরপর আবার রবীন্দ্রনাথের গল্পের ফটিকের ঘটনার মতই আমাদের ফটিক স্কুলে একটা বই হারিয়ে ফেলল৷ কোনও সহপাঠি সম্ভবত নিয়ে নিয়েছিল, সে ইচ্ছা করেই হোক বা মজা করেই হোক৷ ফটিক বাড়ি ফিরে মামীকে সে কথা জনলো৷ মামী বললেন "দেখ ফটিক নতুন করে বই কিনে দেওয়া কোনও ব্যাপার নয়৷ কিন্তু এত সহজ সরল হলে চলবে না৷ এরকম ভাবে থাকলে ভবিষ্যতে সবাই তোমাকে ঠকাবে৷ কেউ তোমার বই নিয়েছে তুমিও কারও বই নিয়ে চলে আসবে৷ কেউ তোমাকে এক ঘা মারলে তুমি তাকে দুই ঘা মারবে৷ আর না পারলে চিরকাল মার খেয়েই যাবে৷" ফটিক আধুনিক শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে থাকল৷
[স্টেপ জাম্প]
অনেকগুলো বছর কেটে গেছে৷ ফটিক এখন কলেজে পড়ে৷ আধুনিক সংস্কৃতি সে রপ্ত করে নিয়েছে৷ বন্ধুবান্ধব অনেক হয়েছে৷ ফটিকের মায়ের একটা অবলম্বন গড়ে উঠছে৷ গ্রামে ফটিকের মাকে হয়ত আর বেশীদিন কষ্ট করতে হবে না৷ কিন্তু বিধাতার মনে কি ছিল কে জানে৷ সেই সুখ হতভাগী মায়ের জুটল না৷
বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নববর্ষের পার্টিতে গিয়ে আকন্ঠ মদ্যপান করে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ল ফটিক৷ আহত হয়ে একজনের মৃত্যু হল৷ পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল ফটিককে৷ বিচারকর্তা ফটিকের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দিলেন৷
ফটিকের মামা-মামী নামী দামী উকিল ধরে সুপ্রীম কোর্টে গেলেন৷ এদিকে জেলে বসে বসে ফটিকের চৈতন্য হল৷ গ্রামের ফটিক কে ত্যাগ করে সে কেমন করে এই ফটিক হয়ে পড়ল৷ হৈ-হুল্লোড়, বে-হিসাবী জীবন মাদক, বান্ধবীসঙ্গ তাকে কারাগারে এনে ফেলেছে৷ জেলখানায় বসে বসে ফটিকের সময় কাটতে চায় না৷
একদিন জেলের এক বয়স্ক প্রহরীকে ফটিক বলল দাদা আমাকে দু-একটা বই এনে দেবেন৷ প্রহরী খুশি হয়ে পরেরদিন একটা বই এনে দিল৷ ছোট বই৷ সারাদিন কতবার সেই একই বই বারবার পড়তে লাগল ফটিক৷ সহবন্দীরা দেখে অবাক৷
পরের দিন মামা-মামী এল ফটিকের সাথে দেখা করতে৷ মামী কাঁদতে লাগল৷ ফটিক বলিল মামী এদিকে এসো কানে কানে একটা কথা বলব৷ মামী কাছে গেলে ফটিক মামীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল৷ এবং জোরে কামড়ে দাঁত দিয়ে মামীর একটা কান কাটিয়া নিল৷ আর মামীর হাতে জেল প্রহরীর দেওয়া বইটা দিয়ে বলল- এই বইটা যদি ছোটবেলায় আমাকে পড়াতে তাহলে আজ আমার এই দূর্দশা হত না৷
[শেষ ]
পুনশ্চ- জেল প্রহরী ফটিককে কি বই দিয়েছিল ?
No comments:
Post a Comment