এই লেখার শুরুতেই আসুন পরিচয় করিয়ে দিই শুভঙ্কর পন্ডিতের সঙ্গে৷ শুভঙ্কর আমাদের স্কুলের একমাত্র প্রতিবন্ধী ছাত্র৷ ভালো করে হাঁটতে পারে না৷ পঞ্চম শ্রেণীতে যেদিন সে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল সেদিন তার উপর মায়া পড়ে গিয়েছিল৷
চরম দরিদ্র পরিবারের ছেলে সে৷ সুযোগ থাকায় মানবিকতার খাতিরে প্রধানশিক্ষকে বলে ওর মা কে মিড-ডে-মিলের রাধুঁনির কাজ পাইয়ে দিয়েছিলাম৷
তার পর কতগুলো বছর কেটে গেছে৷ নিয়মমাফিক প্রতিবন্ধী হিসাবে শুভঙ্কর যাতে সরকারি সাহায়্য পায় তার ব্যবস্থা করেছি, সর্বশিক্ষা মিশন শুধুমাত্র ওর জন্যই প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা খরচ করে বিশেষ বাথরুম করে দিয়েছে৷ কিন্তু শুভঙ্কর পারে নি, ২০১৬ সালে মাধ্যমিকে সে ফেল করেছিল ৷ ২০১৭ তে আবার সে পরীক্ষা দেবে।
পড়াশোনা না করলেও স্কুলে আসার ভীষন আগ্রহ শুভঙ্করের ৷ সে আবার স্কুলে আসতে চায়৷ নিয়মমত নিয়মিত ক্লাসে সে থাকতে পারবে না৷ তবে দারিদ্র প্রতিবন্ধী ছাত্রের প্রতি দয়াবশত তাকে প্রতিদিন স্কুলের মিড-ডে-মিলে খেয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল৷
খাওয়ার সময়ে আসার কথা বলা হলেও শুভঙ্কর বেশীরভাগ দিন দশটাতেই এসে হাজির৷ শ্রেণী কক্ষে না ঢুকে সে স্কুলের বটতলায় বসে থাকত৷ আমি বরারই দরিদ্র মেধাবীদের সাহায্য করে এসেছি৷ তাই তাকে নিয়ে আমারও মাথাব্যাথা ছিল না৷ যথারীতি শুভঙ্কর ২০১৭ সালের মাধ্যমিকেও ফেল করল৷
তাহলে আজ শুভঙ্করের কথা ভাবছি কেন?
স্কুলে এখনও একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি চলছে৷ গত কাল শুভঙ্করেরর মা করুন মুখে এসে বলল, স্যার আমার ছেলেটা ভর্তি হবে না ? কি উত্তর দেব ভেবে পেলাম না৷
অষ্টম পর্যন্ত ফেল না থাকলেও নবমে আমাদের বিদ্যালয়ে কিছু ছাত্রকে আটকে রাখা হয়৷ তবে দ্বিতীয়বার ফেল করলে তাকে দু-বছর থাকার কারনে প্রমোশন দিয়ে দেওয়া হয়৷
সেই নিয়মের দাবী নিয়েই শুভঙ্করের মা আমার কাছে এসেছিল ছেলেকে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি করতে৷ আমি তাকে বোঝালাম সেটা সম্ভব নয়৷ কিন্তু সে বুঝলো না৷ বার বার একই অনুরোধ করতে লাগল৷ বিরক্ত হয়ে কিছুটা দূর্ব্যাবহার করে ফেললাম৷
তখন থেকে বিবেকটা আমাকে কেবলই প্রশ্ন করছে৷ লেখাপড়া না জানা এক মায়ের কাতর আবেদনে অজ্ঞতা থাকলেও দোষ কি ছিল ? শুভঙ্করের এই ব্যর্থতা শুধুই কি তার? সে নিজের নামটাও ভালো করে লিখতে পারে না! মনে পডে, রেজিষ্ট্রেশন ফর্মে শুধু সইটা করতে গিয়ে তিনটে ফর্ম নষ্ট করেছিল সে ৷
তাহলে এতগুলো বছর ধরে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক কত শিক্ষকের হাত ঘুরে, প্রতিবন্ধী ছাত্র বৃত্তি খরচ করে আমরা শুভঙ্করকে সইটা পর্য়ন্ত শেখাতে পারি নি! এ লজ্জা কি শুধুই শুভঙ্করের?
No comments:
Post a Comment