Friday, 30 June 2017

জামাই ধোলাই

#জামাইষষ্টি#

জামাই ষষ্টিতে গিয়ে শ্বশুর বাড়ীর লোকের হাতে উত্তম-মধ্যম মার খেয়ে বাড়ি ফিরতে হবে কোনও জামাই ভাবতে পারে? অথচ এমনটাই হল আমাদের পাড়ার জয়দেবের সাথে৷ আপনি হয়ত চিনতে পারেন জয়দেবকে৷ সে বাসস্ট্যান্ডে শোনপাপড়ী বিক্রি করে৷

বাবা মারা যাবার পর স্কুলের পাঠ চুকিয়ে অনেক ঘাটের জল খেয়ে জয়দেব এখন বাসস্ট্যান্ডের হকার৷ তার সংসার বলতে বৃদ্ধ মা৷ বাড়ি বলতে মাটির একটা ছিটেবেড়া ঘর৷ আর শয়্যা বলতে ছেঁডা কাঁথার মাটির বিছানা৷

শোনপাপড়ি বিক্রির কারবারটা ভালো জমতে সে সংসারটা একটু সাজানোর চেষ্টা করল। একটা আলমারি, নতুন বাসনপত্র তার সঙ্গে সে একটা তক্তপোষ কিনল যাতে আর মাটিতে শুতে না হয়৷ এর পিছনে আরও একটা কারন ছিল, সেটা তার বিয়ে ৷ বৃদ্ধ মা আর রান্না করতে পারছে না৷

সাদাসিধা জয়দেব কে পাড়ার সবাই হাঁদা ভোঁদা বলত৷ অমানুষিক পরিশ্রম করতে পারলেও তার আধুনিক বুদ্ধিসুদ্ধির অভাব ছিল৷ আর ছিল ভীষন ভীতু৷

বিয়ে আসন্ন, কিন্তু জয়দেবের লজ্জাজনক এক সমস্যা হচ্ছে৷ এত শখ করে সে তক্তপোষ কিনল, অথচ তাতে ঘুমোতেই পারছে না৷ ঘুমের ঘোরে রোজই সে তক্তপোষ থেকে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে৷ কাউকে বলতেও পারছে না৷ রোজই ভাবে ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু রোজই ঘুমের ঘোরে মাটিতে পড়ে যায়৷ যাইহোক, ব্যাপারটা চেপে গিয়েই সে বিয়ের পিড়িতে চেপে বসল৷

নতুন বউ আসার পর ফুলশয্যার রাতে বউকে সব খুলে বলল সে৷ জয়দেবের বউ হেসে অস্থির৷ তবে সেও তো গরীব ঘরের মেয়ে, বাপের ঘরে তক্তোপোষ থাকলেও মাটিতে শোয়া তার অভ্যাস আছে৷ তাই ফুলশয্যাটা মাটিতেই হয়ে গেল৷

মাঝে মাঝে দুজনে তক্তোপোষে ঘুমানোর চেষ্টা করে। মাঝরাত্রে জয়দেব কিন্তু মাটিতে৷ স্বামীর এই মুদ্রাদোষের কথা নতুন বউ লজ্জায় কাউকে বলতে পারল না৷

বৈশাখ মাসে বিয়ের পর কিছুদিনের মধ্যেই জামাইষষ্টি এসে গেল৷ জয়দেব বউকে নিয়ে আর পাঁচজনের মত শ্বশুর বাড়ি গেল প্রথম জামাই আদর খেতে৷

শাশুড়ি সাধ্যমত জামাই আদর করলেন। জয়দেবের শ্বশুরবাড়ির অবস্থাও ভালো নয়৷ তাদেরও ছিটেবেড়া দেওয়া দু-কামরার মাটির ঘর৷ রাত্রিতে মেয়ে জামাইকে একটা ঘর ছেড়ে দিয়ে, শালা, শালিরা অন্য ঘরটিতে এবং শ্বশুর-শাশুড়ি দুয়ারে বিছানা করে শুয়ে পড়লেন৷

এদিকে জয়দেবের বউ চিন্তায় আছে৷ স্বামী যদি রাত্রে তক্তোপোষ থেকে মাটিতে পড়ে যায় তাহলে লজ্জার শেষ থাকবে না ৷ তাই সে রাত্রিবেলা জয়দেব ঘুমিয়ে পড়লে খুব সম্তর্পনে নিজের কাপড়ের আাঁচলটা দিয়ে জয়দেবকে বেঁধে ফেলল৷ যাতে স্বামী পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়৷

তবে ঘটনা যে অন্যকিছু ঘটবে তা নববধু আঁচ করবেই বা কি করে৷ সবদিনের মত জয়দেব যথারীতি বিছানা ছেড়ে মাটিতে৷ আর ঘুমন্ত বউ এর গলায় কাপড়ের আাঁচল ফাঁস হয়ে আটকে গেল৷

মেয়ের গোঁঙানির আওয়াজ শুনে জয়দেবের শ্বশুর বাডীর লোকজনের ঘুম ভেঙ্গে গেল৷ অস্বাভাবিক আওয়াজে শঙ্কিত হয়ে তারা দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকল৷ জয়দেব তখনও বিছানার নিচে ঘুমিয়ে আছে ৷ তারা ভবল জামাই বোধহয় মেয়েকে খুন করার চেষ্টা করছে ৷

জয়দেবের বউ এর শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে৷ দ্রুত গলার ফাঁস খুলে জয়দেবের শাশুড়ি, শালীরা তার জ্ঞান ফেরাতে তৎপর হল৷ অন্যদিকে জয়দেবের ঘুম ভাঙ্গল শালা,শ্বশুরের মারের চোটে৷ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেধড়ক মার খেয়ে জয়দেব কোনও রকমে ছুটে শ্বশুর বাড়ী থেকে পলায়ন করল৷

মেয়ের জ্ঞান ফেরার পর সবাই যখন আসল ঘটনা শুনল, জয়দেব তখন গভীর রাতে হেঁটে হেঁটে বাড়ির পথে৷ গা-গতর ব্যাথা করে ভোরবেলা সে বাড়ী ফিরে এসেছিল ৷ জয়দেব জীবনে আর শ্বশুরবাড়ী যায় নি৷

No comments:

Post a Comment